নিজ চোখে দেখা বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কিছু নষ্ট হয়ে যাওয়ার নমুনা
আমি নিজে সব সময়েই শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতির পক্ষে। এই যে বর্তমান সরকার ক্ষমতায়নের পর থেকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বিরামহীন অপকান্ড চলছে, তারপর ও আমি ছাত্র রাজনীতির পক্ষে। তবে আমার সেই রাজনীতি তথাকথিত রাজনীতি নয়। বর্তমানে শিক্ষাঙ্গনে যে ছাত্র রাজনীতি চলছে সেটাকে আমি ছাত্র রাজনীতি না বলে ছাত্র অপ-রাজনীতি বলতেই বেশি পছন্দ করবো। কেন সেটা অপ-রাজনীতি তা আমার নিজ চোখে দেখা অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
সাধারনত ইউনিভার্সিটি গুলোতে কেমন ধরনের ছাত্র ভর্তি হয়? প্রতিটা জেলার সেরা ছাত্ররাই কিন্তু আসে। আমি যখন ১৯৯৫ সালে শাহজালাল ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই, তখন দেখা গেছে সেখানে আমাদের পুরো হবিগঞ্জ জেলার শীর্ষস্থানীয় মেধাবী ছাত্রগুলোই সুযোগ পেয়েছিলো । বাংলাদেশের সকল সরকারী ইউনিভার্সিটিতে একই চিত্র দেখা যাবে।
আমি ভর্তি হওয়ার পর পরই শাহজালাল ইউনিভার্সিটিতে একটা সংসদ নির্বাচন অনুষ্টিত হয়েছিল, সেই নির্বাচনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। এই নির্বাচনে আমাদের হবিগঞ্জ জেলা স্কুলের সেরা ছাত্র হিমু দা’কে দেখেছিলাম সংষ্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক পদে বিজয়ী হতে। হিমুদা আমাদের দুই বছরের সিনিয়র ছিলেন। আমাদের স্কুলে তখনকার সময়ে উনার ধারে কাছে ও কেউ মার্ক্স তুলতে পারতো না। সেই হিমুদাকে ছাত্রলীগ করতে দেখে আমার নিজের ও লোভ জাগে। কেন আমি ও করবো না?
ফার্স্ট ইয়ারে মেসে থাকলেও ক্যাম্পাসের রাজনীতির খোঁজ খবর রাখতাম। সেকেন্ড ইয়ারে হলে উঠলাম হিমুদা’র খাতিরে। সেই পর্যন্ত ছাত্রলীগকে সুবিবেচক দল হিসেবেই মনে হতো। আমার ধারণা ভেঙে যায় তখনকার এক কাউন্সিলের সময়। আমি বুঝতে পারি ছাত্রলীগ সুবিবেচনা করতে জানে না তার নেতৃত্ব তৈরিতে।
ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদক রফিক কোতোয়াল ও সাংঠনিক সম্পাদক আশরাফুল আজীম রুবন ছিলেন আমাদের ইউনিভার্সিটির সেই কাউন্সিলের অতিথি। আমি তখন পর্যন্ত কোন মিছিলে অংশ নেইনি। সেদিনের কাউন্সিল অনুষ্ঠানে প্রথম থেকেই উপস্থিত ছিলাম এবং আশ্চর্য ব্যাপার খেয়াল করলাম। পুরা হাউস যাদের প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারী হিসেবে চাইছিলো তাদেরকে বাদ দিয়ে রফিক ও রুবন এমন দুইজনের নাম ঘোষনা করলো যাদেরকে আমরা সাধারণ ছাত্র ছাত্রীরা কোন দিন নেতা কেন পাতি-নেতা ও মনে করতাম না। এমনকি একজন এক সময় শিবির করতো। পুরো হাউজ নির্বিকার হয়ে গেলো। রফিক ও রুবনকে বন্দী করে রাখা হলো। মাঝ রাতে শহরতলীর যুবলীগ নেতা জগদীস দাস এসে তাদেরকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় । যাওয়ার সময় ওয়াদা করা হয় যে, এই কমিটি ভেঙে্ দেওয়া হবে।
কিন্তু চাইলেই কি কোন ঘোষিত কমিটি ভেঙে দেওয়া যায়? সংগঠটনের নিয়ম শৃঙ্গখলার খাতিরে সেটা কোন সময়ই করা যায় না বা করা হয় না। আমার কাছে তখন ঘটনা টা খুব অবাক লেগেছিল। আমি তখনই বুঝতে শিখি ছাত্রলীগ তার নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারে না বা জানে না। আমার ধারণা আরো পোক্ত হয় যখন দেখি রফিক-রুবনের ঘোষনা করা কমিটি টানা কয়েক বছর কোন মিছিল করতে পারেনি। আর পারবেই বা কিভাবে? আমার মনে হতো প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারী নিজেরা ছাড়া আর কোন কর্মী-নেতা তাদের সাথে ছিলো না। এই যে জন বিচ্ছিন্ন কোন ছেলে মেয়েকে হুট করে প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারী নির্বাচিত করে ফেলা, এটা আমার দেখা প্রথম ছাত্রলীগের নষ্ট হওয়া।
এক সময় সেই ঘোষিত প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারী ক্যাম্পাস থেকে পাশ করে চলে যায়। এর মধ্যে আমাদের ক্যাম্পাসে কাঁটে আরো ৩-৪ টি বছর। আমি নিজে ও অনেক সক্রিয় হয়ে উঠি রাজনীতিতে; কিন্তু সেই প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারী কে কখনোই মেনে নেওয়া হয় না। তারা ও কোনদিন প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারী হিসেবে কোন বক্তৃতা দিয়েছে বলে মনে পড়ে না। তার মিছিলে থাকতো সাধারন কর্মী হিসেবে।
আমরা অফিসিয়ালী নেতৃত্ব শূন্য হয়ে পড়ি এমনকি আমরা যাদের নেতা মেনে চলতাম তারা ও ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যায়। আমরা কোন কমিটি ছাড়াই ক্যাম্পাসে ছিলাম আরো দুই বছর। নিজেরা বানিয়ে নিয়েছিলাম স্টিয়ারিং কমিটি। কয়েকবার আমরা চেষ্টা করেছি কমিটি করার। কিন্তু কোন সময়েই তা সফলতার মুখ দেখেনি। কি আশ্চর্য ! টানা ৭ বছর ক্যাম্পাসে কাঁটালাম, কমিটি পোইলাম মাত্র একটা। অথচ আমরাই ছিলাম সেইসব কর্মী যারা ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার দশ দিনের দিন ক্যাম্পাসে মিছিল নিয়ে ঢুকেছিলাম, আমাদের মাথার উপর দিয়ে ছাত্রদল-শিবির গুলী চালিয়েছিলো। অথচ সারা বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল কেন, কোন ক্লাস করার সাহস ছিলো না ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের।
এই হলো ছাত্রলী্গের অবস্থা। যেখানে ছাত্র শিবিরের প্রতি বছর একটা করে কমিটি হচ্ছে, আমাদের সাথের ছেলেরা প্রেসিডেন্ট, আমরা তখন ও কর্মী লেভেল নিয়ে ঘুরে বেড়াতাম।
১৯৯৫ থেকে ২০০৯, দীর্ঘ ১৪ বছর। এখনো শাবি ক্যাম্পাসে যারা ছাত্রলীগ করে তাদের সাথে যোগাযোগ আছে। এখনো সেই দীর্ঘশ্বাস ! আমি সুদূর লন্ডনে বসে শুনতে চাই জুনিয়রদের হাহাকার, “দাদা, ক্যাম্পাসে এতোদিন রাজনীতি করলাম, কোন কমিটি পেলাম না!”
আসলেই তাই। ১৪ বছরে মাত্র দুইটা কমিটি। তা ও আবার দু’টা কমিটিতেই অযোগ্যদের নেতা নির্বাচন যেখানে দুটি কমিটিতেই সেক্রেটারী ছিলো যথাক্রমে শিবির ও ছাত্রদল থেকে আসা।
আমি শুধু আমার নিজের দেখা একটা ক্যাম্পাসের উদাহরন দিলাম, আমার জানা মতে সব ক্যাম্পাসেই একই অবস্থা। দেরীতে কমিটি গঠন ও অযোগ্য নেতা নির্বাচন- এই দুইটি প্রধান কারনেই ছাত্রলীগ নষ্ট হয়ে যায়, হয়তো ভবিষ্যতে ও এই নষ্ট হওয়া চলতে থাকবে।
আওয়ামীলীগের এখন উচিত হবে অন্তত দু’টি দিকে নজর দেওয়া। প্রতি বছর ছাত্রলীগের কমিটি গঠন ও সুযোগ্য নেতা নির্বাচন। আর আমি সেই ছাত্র রাজনীতিরই পক্ষে। বর্তমানে যে ছাত্র-অপরাজনীতি চলছে আমি তার পক্ষে নই।
৩ টি মন্তব্য/প্রতিক্রিয়া এসেছে এ পর্যন্ত:
আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে নিচের মন্তব্য-ফর্ম ব্যবহার করুন:
* ভাষা: মন্তব্যের ভাষা হওয়া উচিত (মূলত) বাংলা — অবশ্যই বাংলা হরফে। আর ভাষারীতি লেখ্যভাষা হিসেবে প্রচলিত প্রমিত বাংলা হওয়াই শ্রেয়।
** মডারেশন: মন্তব্যের ক্ষেত্রে এখানে প্রাক-অনুমোদন মডারেশনের চর্চা নেই। তবে যে-সব কারণ উপস্থিত থাকলে প্রকাশিত মন্তব্য বিনা নোটিশে (এবং কোনো ধরণের কারণ-দর্শানো ছাড়াই) পুরোপুরি মুছে দেয়ার বা আংশিক সম্পাদনা করার অধিকার "মুক্তাঙ্গন" সংরক্ষণ করে, সেগুলো হলো: (ক) সাধু এবং চলিত রীতির সংমিশ্রণ; (খ) ত্রুটিপূর্ণ বানানের আধিক্য; (গ) ভাষার দুর্বল, আঞ্চলিক, অগ্রহণযোগ্য বা ছাপার অযোগ্য প্রয়োগ; (ঘ) ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রবণতা, ছিদ্রান্বেষণ ও কলহপ্রিয়তা; (ঙ) অপ্রাসঙ্গিকতা ও বক্তব্যহীনতা। এ ব্যাপারে মডারেশন টিমের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। তাই, চূড়ান্তভাবে পেশ করার আগে "প্রাকবীক্ষণ"-এর মাধ্যমে নিজ-মন্তব্যের প্রকাশিতব্য রূপ যাচাই করে নিন।
*** নিবন্ধিত লেখকদের প্রতি: লেখকের নিজস্ব পাতার প্রকাশিত কাজের তালিকায় আপনার পেশ করা মন্তব্যের তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে লগ-ইন করা অবস্থায় মন্তব্য করুন।














[মন্তব্য-লিন্ক]
সুশান্তকে অনেক ধন্যবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুটির অবতারণা করার জন্য। অনুমান করছি এই পোস্টের বিষয়বস্তু নিয়ে প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু বলার মত কথা রয়েছে অভিজ্ঞতার ঝুলিতে। সবাইকে এতে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানাচ্ছি।
[মন্তব্য-লিন্ক]
আমার মনে হয় না, খুব বড় ধরণের অর্বাচীন ছাড়া কেউ ছাত্ররাজনীতির বিরোধিতা করবে। তবে কথা হলো, স্বাধীনতার পর থেকে ছাত্রসংগঠনগুলির কোনও কোনওটি রাজনৈতিক চেতনাবোধের সূত্রেই এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে। মূল রাজনৈতিক দল যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে, তখন তার রাজনৈতিক চেতনাবোধে অনুপ্রাণিত স্বাধীন কিংবা সহযোগী সংগঠনগুলিও কোনও না কোনওভাবে এস্টাবলিশমেন্টের পক্ষে কাজ করে এবং সেই সূত্রে বখরা নিতে চায়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি এক অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। সুশান্ত এর সমাধান হিসেবে বলছেন, ছাত্রলীগ (কিংবা অন্য যে কোনও ছাত্র সংগঠনের) নিয়মিত কমিটি গঠন ও সুযোগ্য নেতা নির্বাচন। কিন্তু এটিই যথেষ্ট বলে মনে হয় না। তা হলে তো যে-সব সংগঠন নিয়মিত কমিটি গঠন করছেন ও সুযোগ্য নেতা নির্বাচন করছেন, শিক্ষার্থীদের তাদের পক্ষে দাঁড়ানোর কথা এবং তাদের সংগঠন বড় হওয়ার কথা!
তবে সুশান্ত সীমিত পরিসর থেকে শুধু ছাত্রলীগের সমস্যা হিসেবেই বিষয়টিকে দেখছেন। সেই দিক থেকে বলা যায়, এটি ছাত্রলীগের মতো সংগঠন, যা অনেক আগে থেকেই একটি বড় সংগঠন, সেখানে গতিশীলতা আনতে পারে। তবে তারপরও আমার মনে হয়, মূল সংগঠন আওয়ামী লীগ এ সংগঠনের নেতা কর্মীদের ব্যক্তিগত ক্রীড়নক হিসেবে দেখতে চায় কি না সেটি একটি বড় প্রশ্ন। ১৯৯৬ সালের আন্দোলন করার মধ্যে দিয়ে আওয়ামী লীগ দেখিয়েছে (এমনকি এর পরে বিভিন্ন সময়), আন্দোলন গড়ে তোলার জন্যে এর আর তাকে ছাত্রলীগের উপর ষাট-সত্তর-আশির দশকের মতো নির্ভরশীল না হলেও চলে। কিন্তু তারপরও আওয়ামী লীগের নেতারা ছাত্রলীগকে নিজেদের কোটারীস্বার্থে ব্যবহার করছে। ছাত্রলীগ এখনও যা করছে তা সেই সূত্রেই করছে।
মতিউর রহমান বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগকে সামলান। কিন্তু ছাত্রলীগকে সামলাতে হলে কাদের সামলাতে হবে, সেটিই অনুসন্ধান করার বিষয়।
[মন্তব্য-লিন্ক]
@ অবিশ্রুত
আপনাকে ধন্যবাদ প্রসঙ্গটিকে বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে স্থাপন করার জন্য।
ধন্যবাদ জানাই পোস্টলেখক সুশান্তকেও।