বিসর্জন ও পশু
আল্লাহ তাআলা হজরত ইব্রাহিম (আ.) কে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু কোরবানি দিতে। আল্লাহ তাঁর নবীকে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন। স্নেহের পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) ছিলেন হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সবচেয়ে প্রিয়। পিতা হয়ে পুত্রকে কোরবানি দেওয়া অসম্ভব কাজ। কিন্তু আল্লাহর নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে হজরত ইব্রাহিম (আ.) বিনা দ্বিধায় নিজ পুত্রকে কোরবানি দিতে উদ্যত হয়েই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। মহান আল্লাহর নির্দেশে তাঁর ছুরির নিচে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর স্থলে কোরবানি হয়ে যায় একটি দুম্বা। স্রষ্টার প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য ও ত্যাগ স্বীকারের বাণীই এ ঘটনার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।
স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সন্তানের পরিবর্তে হলো পশু, তাহলে পশুর পরিবর্তে এই পরিবর্তনের যুগে অর্থ হলে ক্ষতি কী?
সবাই মিলে একই দিনে এভাবে এতগুলো পশু বিসর্জনের মধ্য দিয়ে নিজেদের পশুশক্তির বিনাশ চেয়ে কী পাশবিকতায় মেতে উঠছি আমরা?
জলবায়ু পরিবর্তনের ত্রাসের মধ্যে থেকে এই দূষণ ছড়ানো কুরবানি ত্যাগ করে, আর্থিক উৎসর্গের কোনো নীতির দিকে যেতে পারে না ধর্মপ্রাণ মুসলিম সমাজ?
৭ টি মন্তব্য/প্রতিক্রিয়া এসেছে এ পর্যন্ত:
আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে নিচের মন্তব্য-ফর্ম ব্যবহার করুন:
* ভাষা: মন্তব্যের ভাষা হওয়া উচিত (মূলত) বাংলা — অবশ্যই বাংলা হরফে। আর ভাষারীতি লেখ্যভাষা হিসেবে প্রচলিত প্রমিত বাংলা হওয়াই শ্রেয়।
** মডারেশন: মন্তব্যের ক্ষেত্রে এখানে প্রাক-অনুমোদন মডারেশনের চর্চা নেই। তবে যে-সব কারণ উপস্থিত থাকলে প্রকাশিত মন্তব্য বিনা নোটিশে (এবং কোনো ধরণের কারণ-দর্শানো ছাড়াই) পুরোপুরি মুছে দেয়ার বা আংশিক সম্পাদনা করার অধিকার "মুক্তাঙ্গন" সংরক্ষণ করে, সেগুলো হলো: (ক) সাধু এবং চলিত রীতির সংমিশ্রণ; (খ) ত্রুটিপূর্ণ বানানের আধিক্য; (গ) ভাষার দুর্বল, আঞ্চলিক, অগ্রহণযোগ্য বা ছাপার অযোগ্য প্রয়োগ; (ঘ) ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রবণতা, ছিদ্রান্বেষণ ও কলহপ্রিয়তা; (ঙ) অপ্রাসঙ্গিকতা ও বক্তব্যহীনতা। এ ব্যাপারে মডারেশন টিমের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। তাই, চূড়ান্তভাবে পেশ করার আগে "প্রাকবীক্ষণ"-এর মাধ্যমে নিজ-মন্তব্যের প্রকাশিতব্য রূপ যাচাই করে নিন।
*** নিবন্ধিত লেখকদের প্রতি: লেখকের নিজস্ব পাতার প্রকাশিত কাজের তালিকায় আপনার পেশ করা মন্তব্যের তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে লগ-ইন করা অবস্থায় মন্তব্য করুন।















১৪ অগ্রহায়ন ১৪১৬ [মন্তব্য-লিন্ক]
এই পুরো ব্যাপারটার ভেতরেও এক ধরণের পশুবৃত্তি কাজ করছে। জঙ্গলে সিংহ একটি মোষ বা হরিণ শিকার করে তার বুকের ওপর দাঁড়িয়ে শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করে।ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমে নেকি বা ছোয়াব হাসিলের আরো অনেক পন্থা থাকা স্বত্তেও “কুরবানী”র নামে পা বেঁধে পশু হত্যার আর কোনই ব্যাখ্যাই নেই সেই সিংহসম দাম্ভিকতা আর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান ছাড়া।
একটা সমাজ কতটা পিছিয়ে থাকা হলে সেখানে এখনো দল বেঁধে নাঙ্গা তলোয়ার হাতে রক্তাক্ত পোশাকে সারাদিনমান এক ধরণের খুনে দৃশ্যের প্রচার চলতে পারে! আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেই খুনে সংস্কৃতিই বহন-লালন করে চলেছে। জবেহ্ সংস্কৃতি।
১৪ অগ্রহায়ন ১৪১৬ [মন্তব্য-লিন্ক]
আপনি সত্যি বলেছেন, কোরবানিতে একধরনের উল্লাসমুখর পশুত্ব আছে। আসলে এই ধর্মের তলোয়ারবাজির স্টেজ-রিহার্সাল হচ্ছে কোরবানি। ইসলাম ধর্মে যে তলোয়ারবাজি আছে (আপনি খেয়াল করে দেখবেন, মুসলমানরা দুইটা কাজ খুব ভালো পারে, এক হচ্ছে, তারা অহরহই ঘোষণা করে যে, দুনিয়ার যা কিছু হচ্ছে এর সবই কোরান শরীফে আছে; দুই হচ্ছে, এই জগতের সমগ্র কাফের-নাসেরা-ইহুদিদের কাজ হচ্ছে, মুসলমানদের সবকিছু মুছে দেয়ার কর্মটি করে যাওয়া।) এই জন্য তারা যখন-তখন জেহাদ ঘোষণা করে। তারা মনে করে তলোয়ারবাজিতে সব এস্টাব্লিস্ট করা যায়। সব ধর্মেই তাই- ভারতের শিবসেনা, ইজরাইলের জঙ্গিরা তাদের মতকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জানবাজি রেখে কাজ করে যাচ্ছে।
১৪ অগ্রহায়ন ১৪১৬ [মন্তব্য-লিন্ক]
ধন্যবাদ মাসুদ করিম, ভোগের আয়োজনে সংযমের আলোচনায়। আত্মসমালোচনা এবং সময়োপযোগিতায় আপনি হয়তো মুসলমানের কুরবানি নিয়ে বলেছেন, কিন্তু আমি বড় পরিসরে অন্য ধর্মের অনুসারী বা নাস্তিকদেরও এই সুযোগে একটি অনুরোধ করব।
প্রতিদিন মুক্তাংগনে অনেক বিষয়ে আলোচনা হয়। এতে আনন্দ লাভ হয়, নতুন বিষয় জানার সুযোগ হয়, সচেতনতা বাড়ে। অন্ততঃ লেখক মন্তব্যকারীর বিদ্যাবুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়, আলাপ, গল্প-গুজব, ঝগড়ার সুযোগ হয়। অনেক সময় লেখার পটভূমি এত ব্যাপক হয় যে শুধু পড়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না।
প্রতিদিনের মাংস খাওয়ার যে অভ্যাস তাই টিকিয়ে রাখে উৎসবের দিনে পশুহত্যার এই ব্যাপক আয়োজন। বেশী মাংস খেলে-মানুষের রোগব্যাধি বেশী হয, উৎপাদনের বিচারে এক কেজি শাক-সবজি,ফল-মূলের তুলনায় এক কেজি মাংসে অনেক বেশী খাদ্য-পুষ্টিদ্রব্য প্রয়োজন। পশুখাদ্য উৎপাদনে অনেক বেশী জমি প্রয়োজন, অনেক বেশী পানি প্রয়োজন, মাংস উৎপাদনে ও প্রক্রিয়াজাতকরণে পানি ও বায়ুদূষণ অনেক বেশী হয়।
গ্রীনহাউস গ্যাসের একটি বড় উৎস মাংস উৎপাদনকারী পশু।
আপনি আচরি ধর্ম – আমি সপ্তাহে একদিন নিরামিষ খাই, এর সাথে একটি ধর্মীয় অনুষঙ্গ জড়িত, তবে মনে হয় এভাবে একদিন আলাদা করে খাওয়া শুরু করাই সহজ। সবাইকে অনুরোধ রইলো। মুক্তাংগনের জন্য শুভেচ্ছা।এই মন্তব্য করতে গিয়ে কত গ্রীনহাউস গ্যাস তৈরী হল কে জানে?
১৪ অগ্রহায়ন ১৪১৬ [মন্তব্য-লিন্ক]
এই বিষয়টি নিয়ে আসলে গভীরভাবে ভাবা দরকার। কিভাবে তথাকথিত এই কুরবানি বা নারকীয় পশুহত্যা উৎসবের বিরুদ্ধে একটি জনমত গড়ে তোলা যায় তা ভাবা উচিত । আপনার আমার মতো অনেকেই এই বিষয়টা মেনে নিতে পারে না, তাদেরকে কি এক প্লাটফর্মে নিয়ে আসা সম্ভব?
পশু জবাই করার চর্চা থেকে উৎসাহিত হয়ে মানুষ জবাই করতে কুণ্ঠা বোধ করে না। এই বিষয়টিও আলোচনায় নিয়ে আসা উচিত।
১৪ অগ্রহায়ন ১৪১৬ [মন্তব্য-লিন্ক]
কোরবানির যে ব্যাপারটি আমার অপছন্দ সেটা হচ্ছে ছোট ছোট শিশুদের সামনে পশু জবাই করা হয় এবং তাদের সামনেই পশুর ছাল ছাড়ানো হয়। কিছু কিছু উপজাতি ধর্মীয় আচার আচরণের অংশ হিসাবে দলবেধে পশু বলি দেয়, সে দৃশ্যও খুব একটা প্রীতিকর নয়। প্রতি বছর পশু জবাইয়ের এই দৃশ্যটি দেখতে দেখতে শিশুদের মধ্যে কোন অপরাধ প্রবৃত্তির জন্ম নেয় কিনা সেটা আমার জানা নেই, তবে Wikipedia তে পড়লাম অনেক নিষ্ঠুর অপরাধীই শিশুকালে পশু নির্যাতন করতো। বাংলাদেশের বড় শহরগুলোতে সাধারণত কোরবানির আগের দিন পশুটি কেনা হয়। কিন্তু মফস্বলের শহরগুলোতে সপ্তাহখানেক আগে কেনা হয়, এই অল্প কয়েকদিনে বাড়ির শিশুদের সাথে পশুটির এক ধরনের সম্পর্ক গড়ে উঠে। কোরবানীর দিন সেই পশুটিকে জবাই করার ব্যাপারটি তাদের কাছে বেশ বেদনাদায়কই হওয়ার কথা (অন্তত আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমার বেশ মন খারাপ হতো)।
যেহেতু পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই মাংসভোজী, কোরবানি বন্ধ হলেও পশুহত্যা বন্ধ হবে না। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ৩০ বিলিয়ন পাউন্ড মাংস বিক্রি হয় এবং সে কারণে কোটি কোটি পশু হত্যা হয়। সাধারণত পশুটিকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে, বিষাক্ত গ্যাস দিয়ে বা মাথায় গুলি করে অজ্ঞান (‘ব্রেইন ডেড’) করা হয় এবং তারপর জবাই করা হয়। ইসলামী বা ইহুদি ধর্মমতে পশু জবাইয়ের আগে পশুকে অজ্ঞান করা নিষেধ। এই অজ্ঞান করা না করা কোনটি পশুর জন্য কম কষ্টদায়ক সেটা নিয়ে বিতর্ক আছে, তবে উইলহেল্ম শুলজ নামে এক জার্মান পশুবিদ তাঁর গবেষনায় দাবী করেছেন ইসলামি বা ইহুদি ধর্মমতে পশু জবাইয়ে পশুর কষ্ট কম হয়।
ইউরোপ বা আমেরিকাতে ইসলামী পদ্ধতিতে পশু জবাই মেনে নেয়া হলেও বাংলাদেশের মত যত্রতত্র পশু জবাই নিষিদ্ধ, সাধারণত কোরবানির আগে কোন ধর্মীয় কসাইখানাতে টাকা দেয়া হলে (একভাগ, না দুভাগ না সাতভাগ এই অনুপাতে) তারাই পশু জবাই করে বাড়িতে মাংস পৌঁছে দেয়। কার গরু কত বড় এই নিয়ে বড়াই করার ব্যাপার নেই, শুধু কোন কসাইখানা কত কম মূল্যে কতভাগ মাংস দিচ্ছে এই নিয়ে একটা প্রতিযোগিতা আছে। আমেরিকাতে যেহেতু হালাল খাবার একটা বড় ব্যবসা (বিশ্বব্যাপী ৬০০ বিলিয়ন ডলার), ইদানীং অনেক বড় অমুসলিম কসাইখানাও এই ব্যবসাতে নেমে পড়েছে। বাংলাদেশেও এই পদ্ধতি চালু হলে শিশুদের সামনে পশু জবাই আর বড় গরু কেনা নিয়ে অযথা প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে।
১৪ অগ্রহায়ন ১৪১৬ [মন্তব্য-লিন্ক]
শুলজ সাহেব জবাই করে ফেলার পর পশুদের ইন্টারভিউ নিতে পেরেছিলেন কি না জানতে ইচ্ছে করছে। হাতে সময় আর খরচ করার মতো অর্থ থাকলে মানুষ কত কিছুই না করে! মুনিমের পুরো বক্তব্যের সাথেই একমত। মনজুরাউল ভাইয়ের এক উপমাতেই মূল বিষয় ধরা পড়ে গেছে: “জবেহ সংস্কৃতি”! ১৯৭১ এ তুখোড় জবেহ-প্রবণ যুদ্ধাপরাধীরা তার প্রমাণ রেখে গেছে ইতিহাসের পাতায়। ধন্যবাদ।
১৪ অগ্রহায়ন ১৪১৬ [মন্তব্য-লিন্ক]
বছরের নির্দিষ্ট সময়ে উপযুক্ত পশু উৎসর্গ করা সচ্ছল মুসলমানদের জন্য অত্যাবশ্যক — এর বিকল্প নির্দেশিত হয়নি; দানের ক্ষেত্রে ছদকা-জাকাতের কথা আলাদাভাবে বলাই আছে এবং কোরবানির প্রসঙ্গে কোরানের বিধান এতই সুস্পষ্ট যে তা নিয়ে ইসলামি শাস্ত্রবিদদের ইজমা-কিয়াসের শরণাপন্ন হওয়ারও দরকার নেই। ‘মুসলমান ঘরে জন্ম নিয়েও যারা নাস্তিক’ (সুশান্তর লেখা থেকে কথাটি নেওয়া) তাঁদের প্রশ্ন তো আসেই না, কিন্তু যাঁরা পূর্ণ-আস্তিক, অল্প-আস্তিক কিংবা দ্বান্দ্বিক তাঁদের কেউ-কেউ হয়তো এই বর্বর প্রথাকে মেনে নেন পারিবারিক-সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি ভেবেই। বিদ্রোহী হওয়ার আগে স্বাধীনতার কথা ভাবতে হয়।
কিন্তু এর বাইরেও, কোরবানি বা কালীপূজা বাদ দিলেও, আমাদের মধ্যে অনেকেই কি মাংসবিলাসে তৃপ্ত নেই? মদ্যপায়ী কয়েকজন বন্ধুকে সোৎসাহে বলতে শুনেছি, ‘মাংস ছাড়া মদ আর নুন ছাড়া পান্তাভাত একই জিনিশ!’ আমরা যদি ব্যক্তিগতভাবে মাংসবর্জনে সম্মত হতে পারি, তাহলে অন্তত প্রতিদিনের বাজারে নিরপরাধ পশুর হত্যাকাণ্ড বহুলাংশেই হ্রাস পাবে। এখানে শাস্ত্রের তাগিদ নেই, শস্ত্রের ভয় নেই। অবশ্য এই ‘মামুলি’ ব্যাপারটি নিয়ে ভাবিত হচ্ছি আমরা মুষ্টিমেয় মানুষ মাত্র; প্রতিবেশী ভদ্রলোককে বা কোনো নিষাদকে নিষেধ করার আগে নিজেই শিহরিত হই মশিউল আলমের ‘মাংসের কারবার’ গল্পের মতো লোমহর্ষক ঘটনার আশঙ্কায়!