মাসুদ করিম

মাসুদ করিম


সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

লেখক। যদিও তার মৃত্যু হয়েছে। পাঠক। যেহেতু সে পুনর্জন্ম ঘটাতে পারে। সমালোচক। কারণ জীবন ধারন তাই করে তোলে আমাদের।



স্বাস্থ্য পান

হুইস্কি

কোন গ্লাসে পরিবেশিত হচ্ছে হুইস্কি সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্লাসের চেহারা যদি হয় টিউলিপ ফুলের মতো, অথবা বৃন্তযুক্ত সুগোল পাত্রে ঢেলে দেওয়া যায় এই পরম রমনীয় পানীয়টিকে, তবে কোনো কথাই নেই। তাকিয়ে দেখুন এর সৌন্দর্য, ধীরে ধীরে আঙুলের মৃদু আন্দোলনে পানীয়টিকে নাড়ান গ্লাসের মধ্যে। মদের সুবাস ঘন হয়ে উঠুক পাত্রের মধ্যাংশে। সামান্য জল মিশিয়ে নিন, আঘ্রাণ করুন পানীয়টি। এবার হাল্কা চুমুক দিন। মুখের মধ্যে ধরে রাখুন গৃহীত পানীয়টুকু। অনুভব করুন জিহ্বায় চারিয়ে সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম স্বাদ, পাত্রের ঘ্রাণের মতো নিজের ভেতরেও ঘ্রাণের আমেজ টের পাবেন।

রাম

বহু রূপে পাওয়া যায় এ মদ। ‘লাইট’ বা ‘হোয়াইট’ রামে পাবেন মৃদু মিষ্টত্ব, কিন্তু স্বাদে গন্ধে এমন কিছু অনবদ্য নয় এ বস্তু—মূলত, ককটেলে এর ব্যবহার। ‘গোল্ড’ রামে পাবেন এক প্রাচীন সুবাস। অনেক বছর কাঠের পিপেতে রেখে তারপর বোতলে ঢোকানো হয় এই রাম। এর সোনালী রঙের কারণ ওই কাঠের পিপে। গোল্ড রামের চেয়েও এক পরত বেশি গাঢ় রঙের ডার্ক রাম তৈরি হয়ে ওঠে পুড়ে ঝামা হওয়া পিপেতে। স্বাদে গন্ধে অত্যন্ত কড়া—আঘ্রাণ করলে মিলতে পারে ঝোলাগুড় অথবা ক্যারামেলের গন্ধ। রামের বিবিধ মিশ্রণে ডার্ক রাম ব্যবহৃত হয় রঙ আর গন্ধে মিশ্রণটিকে সবল করে তুলতে। টাইপ করছিলাম, নিজেকে সামলাতে পারলাম না, দূর্গাপুজোর নবমীর রাতে প্রচণ্ড উল্লসিত উন্মত্ততার পর বিছানায় এলিয়ে যাবার আগে যদি নিখাদ ‘গোল্ড রাম’ কয়েক ঢোক গলায় ঢেলে দিতে পারেন, আহ! কী মোহনীয় পাতালবাস হয় ভরদুপুর পর্যন্ত।(এটুকু অস্বাস্থ্য)।

ওয়াইন

দ্রাক্ষাফলের অমোঘ আহ্বান নিয়ে বিরাজমান বহুবর্ণের, বহু স্বাদের, বহুরূপী ওয়াইন। নিস্পিষ্ট আঙুরের রসে ‘ইস্ট’ মিশিয়ে প্রস্তুত করা হয় ওয়াইন।
ওয়াইনের যথার্থ স্বাদগ্রহণ সাধনা ছাড়া সম্ভব নয়। বর্তুলাকার, বড়-পরিধির বৃন্তযুক্ত পাত্রে ঢেলে নিন আপনার পছন্দের ওয়াইন। দেখুন তার রঙ। নাসারন্ধ্রের খুব কাছে নিয়ে এসে গ্লাসের তরলটিকে সামান্য আন্দোলিত করুন গভীর শ্বাসে। মুখে নিন সামান্য ওয়াইন। গিলবেন না, জিভে-টাগরায় অনুভব করুন জটিল, দুরূহ সব স্বাদ-গন্ধের মায়াজাল বিস্তার। এবার গিলে নিন। সাধনায় হয়তো এমনও দিন আসতে পারে, যেদিন এক-চুমুকে বুঝে নেবেন কোন বছরের, কোন বাগানের দ্রাক্ষাজাত ওয়াইন রয়েছে আপনার গ্লাসে।

বিয়ার

স্টার্চ থেকে প্রস্তুত হয় বিয়ার। ‘মল্টেড বার্লি’ এ পানীয়ের সর্বপ্রধান উৎস। ‘হপ’ গাছের ফুল যোগ করা হয় বিয়ার প্রস্তুতকালে—তার ফলে আসে পানীয়টির তিক্ত স্বাদ। নানাজাতের, হরেক প্রকারের বিয়ার মেলে বাজারে। যেমন “এল”—শ্রেষ্ঠ ইস্টে জারানো এই বিয়ার। পাবেন “লাগার” বিয়ার—সাত থেকে বারো ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে এ বিয়ারের প্রথম দফার প্রস্তুতি। তারপরেও শূন্য থেকে চার ডিগ্রী সেন্টিগ্রেডে রাখা হয় এই বিয়ার প্রস্তুত করার সময়।
বিয়ার পান করতে গেলে সচেতন হতে হবে পানীয়ের তাপমাত্রা সম্বন্ধে। হাল্কা লাগার বিয়ার পান করুন আট ডিগ্রীর কম তাপমাত্রায়। ডার্ক লাগারের তাপমাত্রা যেন না ছড়ায় নয় ডিগ্রী। আবার একটু টাইপ থেকে বেরতে হল। বিয়ার খেতে পাই না কতদিন! এখানে পড়ুন : এই অসম্মান

ভদকা

ভুট্টা থেকে তৈরি হয় ভদকা, হয় আলু থেকেও। ময়দা থেকে নির্মিত হয় এ পানীয়, আবার “রাই” নামক শস্যও ব্যবহৃত হয় এর নির্মাণে।এর পলে এক ভদকার থেকে অন্যের তফাৎ প্রায় আলোকবর্ষী। যে রকম ভদক্ কিনুন না কেন, গুণগত মানে তা যেন হয় প্রথম শ্রেণীর।
পানীয়টিকে সযত্নে রাখুন ফ্রিজে। ঠান্ডা অবস্থায় এ সুরার সূক্ষ্ম মিষ্টত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। ঢালুন ঠান্ডা গ্লাসে, ছোট ছোট চুমুকে পান করুন এই পানীয়।মন-প্রাণ জুড়িয়ে যাবে।

জিন

জুনিপারের গন্ধ পাবেন জিনে। ডিস্টিলড জিন প্রস্তুত করা হয় “হোয়াইট গ্রেন স্পিরিট” থেকে, তারপর তাতে মেশে জুনিপার ফল।
জিনের ব্যবহার আছে বিভিন্ন মিশ্র পানীয়ে, ইংরেজিতে যাকে বলে mixed drink। জিন ব্যবহার করুন ককটেল বানাতে। এ পানীয়, যকে বলে, বেশ “ড্রাই”। জিন পান করলে পিপাসার্ত বোধ করতে পারেন। যথেষ্ট “টনিক ওয়াটার” অথবা “ওয়াইন” মেশান জিনের ককটেলে। বিশুষ্ক জিনকে আর্দ্র করার এ-এক পদ্ধতি।

**দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়ার বাংলা সাময়িকী “সময়” থেকে সংকলিত।

পোস্ট কিংবা মন্তব্যে প্রকাশিত মতামত কোন অবস্থাতেই মুক্তাঙ্গন কর্তৃপক্ষের মতামতের প্রতিফলন নয়। বক্তব্যের দায়ভার লেখক এবং মন্তব্যকারীর নিজের। শুধুমাত্র "মুক্তাঙ্গন" নামের আওতায় প্রকাশিত বক্তব্যই ব্লগের যৌথ অবস্থানকে নির্দেশ করে।


১১ টি মন্তব্য/প্রতিক্রিয়া এসেছে এ পর্যন্ত:

  1. বিনয়ভূষণ ধর বিনয়ভূষণ ধর লিখেছেন:

    ভদকা
    ভুট্টা থেকে তৈরি হয় ভদকা, হয় আরু থেকেও। ময়দা থেকে নির্মিত হয় এ পানীয়, আবার “রাই” নামক শস্যও ব্যবহৃত হয় এর নির্মাণে।এর পলে এক ভদকার থেকে অন্যের তফাৎ প্রায় আলোকবর্ষী। যে রকম ভদক্ কিনুন না কেন, গুণগত মানে তা যেন হয় প্রথম শ্রেণীর।
    পানীয়টিকে সযত্নে রাখুন ফ্রিজে। ঠান্ডা অবস্থায় এ সুরার সূক্ষ্ম মিষ্টত্ব প্রকট হয়ে ওঠে। ঢালুন ঠান্ডা গ্লাসে, ছোট ছোট চুমুকে পান করুন এই পানীয়।মন-প্রাণ জুড়িয়ে যাবে।

    মাসুদ করিম! আমার ভাই বারো মাসই ভদ্‌কা প্রিয় লাগে। কিছুদিন আগে ‘বাতিঘর”-এ কিছু পকেট সাইজের বই দেখলাম। যেখানে Wine//Whiskey-র উপর লেখা ছিলো। সংগ্রহে না থাকলে নিয়ে নিতে পারেন কপিগুলো। প্রথম শ্রেণীর জিনিস কোথায় আর পাবো বলুন! আমাদের দর্শনা’র “কেরু এ্যান্ড কোং”-এর Vodka কিন্তু খারাপ নয় একেবারে।

  2. Tokon Thaakoor লিখেছেন:

    ami comred, Artist Rashid Aminer songe ekmot poshon korcchi, ji, banglar ghore ghore poucche deowa dorkar.

  3. Tokon Thaakoor লিখেছেন:

    eta abar ki kotha je, nete montobbo kore wait korte hobe! train ki ekhaneo late kore asbe?

    • ৩.১
      মুক্তাঙ্গন মুক্তাঙ্গন লিখেছেন:

      @ টোকন ঠাকুর,

      মন্তব্য কিন্তু সরাসরিই প্রকাশিত হয়ে থাকে এখন। আপনার কেন অপেক্ষা করতে হল বুঝতে পারছি না। মন্তব্য দেয়ার ঠিক পর পরই পাতাটি রিফ্রেশ/রিলোড করলেই সেটা দেখতে পাবার কথা। আপনি রিলোড করে দেখেছিলেন? এই বিষয়টা নিয়ে মন্তব্যকারীরা যেন বিভ্রান্ত না হন সেজন্য প্রতিটি মন্তব্য পেশের পর ধন্যবাদ জানিয়ে একটি স্বয়ংক্রিয় বার্তা দেখানো হয় (সবুজ বর্ডার এর ভেতর)। বার্তাটি এরকম:

      ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য। ঠিক এখনি দেখতে না পেলেও মন্তব্য-পেশ সফল হয়েছে। এই পাতা রিলোড/রিফ্রেশ হলেই আপনার সদ্য পেশকৃত মন্তব্যটি দেখতে পাবেন। কখনো কখনো সাইটের স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে কোনো মন্তব্যে যদি লিন্ক (URL) এর আধিক্য থাকে, তার তাৎক্ষণিক প্রকাশ এভাবে স্থগিত হয়ে যায়, সম্ভাব্য “স্প্যাম” বিবেচনায়। আপনি যদি মনে করেন আপনার মন্তব্যটি ত্রুটিবশতঃ স্থগিত হয়ে আছে (অর্থাৎ, এটি স্প্যাম নয়) তাহলে যত দ্রুত সম্ভব ব্লগ-এডমিনকে অবহিত করুন যাতে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয়। আবারও ধন্যবাদ।

  4. বিনয়ভূষণ ধর বিনয়ভূষণ ধর লিখেছেন:

    @টোকন ঠাকুর!
    প্রণাম ঠাকুরদা! আমাদের ভুবনে আপনাকে স্বাগতম জানাচ্ছি। আপনার লেখা বা মন্তব্য এখন থেকে এখানে নিয়মিত পাবো বলে আশা করছি।

  5. মুয়িন পার্ভেজ মুয়িন পার্ভেজ লিখেছেন:

    মদ্যবিষয়ক তৃষ্ণাজাগানিয়া এই গদ্য বেশ ভালো লাগল। সুরারসিকেরা নিশ্চয়ই এর মর্ম আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। পড়তে পড়তে আমার মনে প’ড়ে গেল সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি সংলাপময় প্রেমাতুর কবিতাংশ :

    – তুমি একটু স্বস্থ হও, আমার প্রশ্নটা একটু
    মন দিয়ে শোনো
    – স্বস্থ? এটা বাংলা বুঝি? সুস্থ নয়?
    কখনো শুনিনি
    – বড্ড বেশি পানটান হয়ে গেছে। তাই না? এখন তুমি
    কিছুই বুঝবে না
    – বড্ড বেশি কাকে বলে! নীরোদ সি চৌধুরী ঠিক
    এক পেগ, পণ্ডিত নেহরু দুটো
    জ্যোতি বসু আড়াই শুনেছি, আর আমি
    শূন্য আঁকড়ে বসে আছি, পান নয় টান শুধু টান

    ( ‘ভালোবাসা! ভালোবাসা!’, সানন্দা, বর্ষ ১১, সংখ্যা ১৭, ১১ এপ্রিল ১৯৯৭, কলকাতা, পৃ. ১০৫)

    নেহরু-জ্যোতির পানীয় সংক্রান্ত কোনো ‘এলাহাবাদ প্রশস্তি’ পাইনি, তবে নীরদচন্দ্র চৌধুরীর (১৮৯৭-১৯৯৯) মদ্যপ্রীতি ও আতিথেয়তার কৌতুকপ্রদ বিশদ বিবরণ দিয়েছেন নবনীতা দেবসেন :

    আমি আর মাসিমা [অমিয়া চৌধুরানি] গল্প করছি ওপরের ঘরে, নীরদবাবু উঠে এলেন –
    “কী খাবে? চা, না কফি?”
    “কে তৈরি করবে? আমি, না আপনি?” কেননা ওঁদের সংসারে সাহায্যকারিণী মেয়েদের কেউই এই সময়টায় থাকে না।
    “আমি অবশ্যই। তুমি কী ভেবেছ চা-কফি বানাতে পারি না?”
    “তাহলে কোনওটাই না।”
    নীরদবাবু হেসে উঠলেন, দুষ্টু-দুষ্টু চোখে চশমার ফাঁকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভুলেই গেছি, ছ’টা বেজে গেছে। সন্ধ্যার পর তো চা-কফি দেবার কথাই নয়! কী দেব? ভাল ক্ল্যারেট আছে। দিই?” আমি মোদো টাইপের লোক নই। কিন্তু বাবার মতো টিটোটলারও নই। ভাল ওয়াইন পেলে নিশ্চয় তার সদ্ব্যবহার করতে জানি। আর নীরদবাবুর ওয়াইন সেলার জগদ্বিখ্যাত হয়ে গেছে। তাঁর ‘ভাণ্ডারে রাশি রাশি সোনাদানা ঠাসাঠাসি’ হয়তো নেই, কিন্তু দুর্মূল্য গ্রন্থ, দুষ্প্রাপ্য রেকর্ড, মহার্ঘ ওয়াইন আর দুর্লভ ছবি আছে।

    তাহলে বলেই ফেলা যাক। সেই প্রথমতম দিনে নীরদবাবুর বাড়িতে একটু মনঃকষ্ট হয়েছিল। ওয়াইন প্রসঙ্গ আলোচনা করতে করতে নীরদবাবু একের পর এক দুর্মূল্য ওয়াইনের বোতল এনে আমাদের দেখিয়ে, তাদের ঠিকুজিকুলুজি বোঝাতে লাগলেন। তারপর অনাঘ্রাত কুসুমের মতোই তারা যথাস্থানে ফিরে যেতে লাগল। দুটো অসামান্য শ্যপাঁঞ (আমরা লিখি ‘শ্যাম্পেন’, নীরদবাবু লেখেন ‘শ্যাপাঁঞি’) দেখালেন। কোনওটাই খোলা হল না। আমি আর তপনদা [তপন রায়চৌধুরী] তার পক্ষে যথেষ্ট খানদানি অতিথি ছিলুম না।

    তবে হ্যাঁ, সবচেয়ে দুঃখ হয়েছিল আর এক দিন, উনি যখন বিরাট এক বাক্স চকোলেট এনে আমাকে দেখিয়ে বলেছিলেন বেলজিয়াম থেকে কোনও বিশিষ্ট অতিথি তাঁকে এই বিশেষ চকোলেট উপহার দিয়েছেন। কিন্তু বাক্সটা খোলেননি। তাই আজ ক্ল্যারেটের অফার সঙ্গে সঙ্গে অ্যাকসেপ্ট করে নিই। একটু পরে নীরদবাবু আবার সিঁড়ি দিয়ে উঠে এলেন, দু হাতে সাবধানে ট্রে ধরা। তাতে দুর্মূল্য দুটি স্ফটিকের পাত্রে টলটল করছে গাঢ় লাল ক্ল্যারেট, আর একটি মগে ধোঁয়া ওঠা উষ্ণ স্বাস্থ্যকর পানীয়, মাসিমার জন্যে। প্লেটে কাজুবাদাম, আলুভাজা ইত্যাদি। যত্ন করে মাসিমার খাটে ট্রে রেখে, নিজে একটি চেয়ার টেনে এনে বসলেন। তখন বয়স সাতানব্বই। আমাদের সাতাশ বছরের যুবককেও লজ্জা দিতে পারেন, তিনি তাঁর অতিথিসৎকারের নৈপুণ্যে।

    ( ‘একাই একশো’, দেশ, বর্ষ ৬৫, সংখ্যা ১, ১ নভেম্বর ১৯৯৭, কলকাতা, পৃ. ৪০, ৪১)

    নীরদচন্দ্র নিজেই তাঁর ‘মদ্যপানের সাফাই’ লিপিবদ্ধ করেছেন সবিস্তারে, ‘আমি কেন বিলাতে আছি’ নামের ‘কৈফিয়তমূলক’ রচনায় :

    সুরাপায়ী বলিয়া দেশে আমার খ্যাতি বা অখ্যাতি রটিয়াছে। কোনো কোনো সংবাদপত্রে মদের বোতলসহ আমার ফটোগ্রাফ বাহির হওয়াতে এই ধারণা আরও বদ্ধমূল হইয়াছে। ধারণাটা একেবারেই ভিত্তিহীন। আমি মনোরঞ্জনের জন্য কিনিলেও মদ্যপায়ী নই। আমি এইসব ব্যাপারে অত্যন্ত ব্রাহ্মভাবাপন্ন ছিলাম। ১৯৪৬ সন পর্যন্ত মদ্যপান করা দূরে থাকুক পান-তামাক, এমনকি চা পর্যন্ত খাইতাম না। সেই বৎসরে বিশেষ কারণে আমি পত্নীর সহিত পরামর্শ করিয়া মদ্যকে গৃহপ্রবেশ করাই। তখন হইতে আমি ঘরে উচ্চস্তরের মদ্য রাখিয়াছি বটে, কিন্তু তখনও হুইস্কি কিনি নাই। আরও বলিবার আছে, আজ পর্যন্ত নিজের জন্য একটি বোতলও খুলি নাই। শুধু অতিথি আসিলে উহাদের সংবর্ধনা ও আপ্যায়নের জন্য যাহা প্রয়োজন হয় খুলি। দেশেও আমি যথাসম্ভব উচ্চশ্রেণীর ‘ওয়াইন’ কিনিতাম, এখানে উচ্চতম শ্রেণীর কিনি। এই শ্রেণীর মদ্য দূরে থাকুক, গলাধঃকরণের মতো মদ্যও দেশে থাকিলে পাইতাম না। এখানে আমি যে-সব ‘ওয়াইন’ কিনি তাহার নাম করিলে নিজের জাঁক দেখাইবার মতো হইবে। তবু আমার কথা যে সত্য তাহা প্রমাণ করিবার জন্য তিনটির নাম করি — ক্ল্যারেট পেট্রুস্, হক্ এট্রিসের লেনশেন্ বেরেনআউস্‌লেজে আইস্ ভাইন (১৯৭১ সন), ও শ্যাম্পেন ভম পেরিনিয়োঁ। যাঁহারা এ বিষয়ে সন্ধান রাখেন তাঁহারা বুঝিবেন এসবের তাৎপর্য কি। আমি বিত্তহীন হইলেও এসব রাখি দেশের সম্মান রাখিবার জন্য। অভিজাত ইংরেজ আসিলেও যাহাতে না বলিতে পারেন ‘আহা! ইহারা ভারতীয়, ইহাদের অজ্ঞতা ও রুচিহীনতা ক্ষমা করিতে হইবে।’ আমি নিজের অপমান কখনও সহ্য করি নাই, দেশের অপমানকে বাপ তুলিয়া গালির মতো মনে করি। আমার মদ্যপানের এই সাফাই।

    (দেশ, শারদীয় ১৩৯৯, কলকাতা, পৃ. ১৬৮)

    নবনীতা নীরদচন্দ্রের ‘মহার্ঘ ওয়াইন’-এর সঙ্গে তাঁর মহার্ঘ স্মৃতিশক্তিরও প্রশংসা করেছেন দৃষ্টান্তসহ। আমরা মনে রাখতে পারি, নীরদচন্দ্র তাঁর শেষ বইটি (Three Horsemen of the New Apocalypse) লেখেন নিরানব্বই বছর বয়সে — একেই বোধহয় বলা যায় মনসিজ মজুমদারের ভাষায় ‘প্রতিস্পর্ধী বার্ধক্য’ (দেশ, বর্ষ ৬৫, সংখ্যা ১, ১ নভেম্বর ১৯৯৭, কলকাতা)! পরিমিত মাত্রায় মদ্যসেবন কি তাহলে স্মৃতিশক্তি বা সৃজনশীলতার পক্ষেই কাজ করে মৃতসঞ্জীবনীর মতো? অন্যদিকে, অপরিমিত পানীয়ব্যসনের মাত্রাও বা কেমন হতে পারে তার একটি নমুনা দেখা যাক। এক সাক্ষাৎকারে, ‘আপনি কি মদ্যপান করেন?’ — শরীফা বুলবুলের এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন হুমায়ুন আজাদ, ‘করি। মানুষ গত কয়েক হাজার বছরে যত রকম খাদ্য এবং পানীয় উদ্ভাবন করেছে তার মধ্যে মদ্য একটি অসাধারণ বস্তু।’ এরপর তিনি শোনান এক দীর্ঘ পান-অভিজ্ঞতার মনোহর গল্প :

    আমি একবার আমেরিকা যাওয়ার পথে যখন বিমানে উঠি, বিমান তরুনী [তরুণী] (বিমান বালা) আমাকে বলছে, কি [কী] পান করতে চান? আমি বললাম, রেড ওয়াইন। আমি রেড ওয়াইন পান করতে করতে আবুধাবীতে পৌঁচেছি [পৌঁছেছি], আবার সেখান থেকে রেড ওয়াইন পান করতে করতে নিউইয়র্কের কেনেডি বিমান বন্দরে নেমেছি। আমার দাঁত লাল হয়ে গেছে, ওখানে যাওয়ার পর সবাই ধরেছে স্যার আপনি কি [কী] পান করবেন? হুইস্কি না বিয়ার? না ওয়াইন-পান করবেন? আবার আসার পথে ঠিক করেছি এবার হোয়াইট ওয়াইন খাব এবং পান করতে করতে করতে করতে ঢাকায় এসে নেমেছি হা হা হা হা।

    (হুমায়ুন আজাদ : এই বাঙলার সক্রেটিস, জামাল উদ্দিন ও শরীফা বুলবুল সম্পাদিত, ফেব্রুয়ারি ২০০৪, বলাকা প্রকাশন, চট্টগ্রাম, পৃ. ১০৫, ১০৬)

    পরিমিত-অপরিমিত যা-ই হোক, সুরসিক ব্যক্তিরা সুরাপানে সম্ভবত সে-পর্যায়ে যান না যাকে মাতলামি বলা যায়, কিন্তু সাধারণ অসচ্ছল মানুষেরা মদ্যপ হয়ে উঠলে তা কত ভয়ঙ্কর হতে পারে, তার সাক্ষ্য সাম্প্রতিক একটি খবর থেকে নেওয়া যাক :

    আদাবরে নেশাগ্রস্ত স্বামীর হাতে স্ত্রী খুন
    কাগজ প্রতিবেদক

    রাজধানীর আদাবর এলাকায় নেশাগ্রস্ত স্বামীর হাতে আখি [আঁখি] আক্তার (১৯) নামে এক গৃহবধূ নিহত হয়েছে। বুধবার গভীর রাতে টাকা-পয়সা নিয়ে ঝগড়ার জের ধরে পাষণ্ড স্বামী মোঃ সিরাজ তাকে গলা টিপে হত্যা করে। এদিকে আঁখি আত্মহত্যা করেছে বলে পালানোর সময় গতকাল বুধবার স্থানীয় লোকজন সিরাজকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করেছে।
    ***
    সিরাজ রিকশা চালক এবং আঁখি একটি গার্মেন্টসে চাকরি করে।

    (ভোরের কাগজ, বর্ষ ১৮, সংখ্যা ২৩৭, ১৬ অক্টোবর ২০০৯, ঢাকা, পৃ. ৮)

  6. মাসুদ করিম মাসুদ করিম লিখেছেন:

    এক পাইন্ট বিয়ারে যে এত আনন্দ পাই, তা তো এমনি এমনি নয়, এতো সভ্যতার প্রথম আনন্দ, রুটির আগেই এসেছিল বিয়ার, কৃষির শুরু এলকোহলিক পানীয় তৈরির দানা সংগ্রহেরই উদ্দেশ্যে — মার্কিন প্রত্নতত্ত্ববিদ প্যাট্রিক ম্যাকগভার্নের গবেষণা নিয়ে লিখছেন Frank Thadeusz, Alcohol’s Neolithic Origins

    • ৬.১
      ইমতিয়ার শামীম ইমতিয়ার লিখেছেন:

      সীমাহীন আনন্দ পেলাম মাসুদ ভাই। যদিও আবুল হাসানের ওই কবিতার মতো বলতে হয়, ‘এখন পারি না। একসময় আমিও পারতাম/ আমারও প্রিয় ছিল…’। আমাদের পূর্বপুরুষগণ সত্যিই সমঝদার ছিলেন। এ যে কত বড় শিল্প, ক্রমশই আমরা বিস্মৃত হচ্ছি, দুঃখ এই।
      তো হয়ে যাক না হয়, এই পুনরাবিষ্কার উপলক্ষে বড়দিনের আগেই…

    • ৬.২
      কামরুজ্জামান  জাহাঙ্গীর কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর লিখেছেন:

      মাসুদ করিম,
      গুরু আমার, আপনাকে শাদামাটা প্রণাম নয়, ষাষ্টাঙ্গে প্রণাক করণের স্বাদ হয় (আরে ধুর, গ্যাঞ্জাইম্যে-দুনিয়ায় বয়স নিয়া অত ভাবলে চলে?)। খোদার কসম, আপনি যে ২৭ অগাস্ট ২০০৯-এ নেশা জাগানিয়া কাজ-কর্ম শুরু করলেন, তা তো এখনও থামল না।
      একবার আমার আপন বড়োভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, রাশিয়াতে ভদকা ভক্ষণের এত গল্প শোনা যায়, তা কি সত্যি? রাশিয়াতে পড়াশুনা করতে থাকা (তা ১৯৮১-৮২ সালের কথা) ভাইজান বললেন, আমাদের দেশে কাউকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি পানি পান করেন কিনা- তা যেমন হাস্যকর একটা কথা প্রশ্ন, তেমনি রাশিয়াতে ভদকাও পানি-ভাত আর-কী! তো, তখন থেকেই আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম, পৃথিবীর স্বর্গ আসলে কাশ্মির নয়, রাশিয়া। সমাজতন্ত্রের সাথে ভদকার এমন সহমিলন- তাহলে রাশিয়া কেন ভূস্বর্গ নয় হাহাহা!
      এখন মাসুদ করিমের পোস্টটি ঠোটস্থ, জিবস্থ, গলাস্থ, পেটস্থ, এমনকি মলস্থ করতে করতে মনে হচ্ছে, আহারে যদি বেহেশত থাকত, আর আমি যদি তার বাসিন্দা হতাম, তবে শ্রীমান সৃষ্টিকর্তাকে মাসুদ করিমের পোস্টটি ধরিয়ে দিয়ে বলতাম, গুরু. আমি আর কিচ্ছু চাই না। আমি যা চাই, তা এই লিস্টে বিস্তারিত লিপিব্দ্ধ আছে। দুনিয়ায় আপনার পেয়ারের মোল্লাদের যন্ত্রণায় অনেক কষ্টে নিজেরে কন্ট্রোল করছি। এইখানে তো আপনিই রাজা, আর হেথায় ত নিষেধ মালই ফরজ করা আছে – নাকি?

  7. আমাদের এক সোমরসিক অগ্রজ একটি পানশালার নতুন নাম দিয়েছিলেন ‘দাগেস্তান’। কেন এই নামকরণ? ‘On Wine Horns’ শিরোনামের অনবদ্য কবিতিকা-গুচ্ছটি তো দাগেস্তানেরই এক কবির লেখা! কয়েকটি কবিতিকা পড়া যাক –

    Here’s to the drinkers of wine
    Who pour and adore it,
    Explore all the lore of the vine
    Or blithely ignore it!

    * * *

    Man drank and died, still drink – and die.
    But shall Death pass non-drinkers by?

    * * *

    Come drink, procrastinator,
    We’ll find a reason later!

    * * *

    All that is said when good wine flows,
    Better than God, the wine horn knows.

    * * *

    Drink your fill of fragrant foam
    But don’t forget the way back home!

    * * *

    A ban on drink won’t stop a drinking man,
    Nor does it stop the authors of the ban.

    * * *

    Rain swells the stalk,
    And wine, our talk.

    * * *

    A wise man drank, into a fool he grew.
    The opposite has often happened, too.

    * * *

    You pour the wine and drink it like a king,
    But soon discover you’re its underling!

    * * *

    Full of wine? Uplift it!
    Empty? Swiftly fill it!

    * * *

    Wine suites all men, it’s such
    A pleasure to consume,
    But you must know how much,
    Why, when, where, and … with whom.

    • ৭.১
      অঞ্জন সরকার  জিমি অঞ্জন সরকার জিমি লিখেছেন:

      মদ্য নিয়ে অনবদ্য গদ্যটি সদ্য পড়ে শেষ করলাম। মাসুদ ভাই, অদ্য এই অভাজনের গ্রহণ করুন লাল সালাম।

আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে নিচের মন্তব্য-ফর্ম ব্যবহার করুন:

=নিয়মাবলি=
* ভাষা: মন্তব্যের ভাষা হওয়া উচিত (মূলত) বাংলা — অবশ্যই বাংলা হরফে। আর ভাষারীতি লেখ্যভাষা হিসেবে প্রচলিত প্রমিত বাংলা হওয়াই শ্রেয়।
** মডারেশন: মন্তব্যের ক্ষেত্রে এখানে প্রাক-অনুমোদন মডারেশনের চর্চা নেই। তবে যে-সব কারণ উপস্থিত থাকলে প্রকাশিত মন্তব্য বিনা নোটিশে (এবং কোনো ধরণের কারণ-দর্শানো ছাড়াই) পুরোপুরি মুছে দেয়ার বা আংশিক সম্পাদনা করার অধিকার "মুক্তাঙ্গন" সংরক্ষণ করে, সেগুলো হলো: (ক) সাধু এবং চলিত রীতির সংমিশ্রণ; (খ) ত্রুটিপূর্ণ বানানের আধিক্য; (গ) ভাষার দুর্বল, আঞ্চলিক, অগ্রহণযোগ্য বা ছাপার অযোগ্য প্রয়োগ; (ঘ) ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রবণতা, ছিদ্রান্বেষণ ও কলহপ্রিয়তা; (ঙ) অপ্রাসঙ্গিকতা ও বক্তব্যহীনতা। এ ব্যাপারে মডারেশন টিমের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। তাই, চূড়ান্তভাবে পেশ করার আগে "প্রাকবীক্ষণ"-এর মাধ্যমে নিজ-মন্তব্যের প্রকাশিতব্য রূপ যাচাই করে নিন।
*** নিবন্ধিত লেখকদের প্রতি: লেখকের নিজস্ব পাতার প্রকাশিত কাজের তালিকায় আপনার পেশ করা মন্তব্যের তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে লগ-ইন করা অবস্থায় মন্তব্য করুন।


অভ্র প্রভাত ফোনেটিক ইউনিজয় ইংরেজী
------------(মাউস ক্লিক করে বাংলা লিখুন)------------


বাংলায় মতামত লিখতে নিচের যে কোন একটি পদ্ধতি বেছে নিন:
(ক) সংযুক্ত চারটি বাংলা কী‌বোর্ডের (ইউনিজয়, ফোনেটিক, প্রভাত) যে কোন একটি বেছে নিয়ে; অথবা, (খ) গুগল বাংলা ট্রান্সলিটারেশন টুল ব্যবহার করেও সহজে বাংলা লেখা সম্ভব। বাংলা অক্ষর চালু/বন্ধ করতে ctrl+g চাপুন। শব্দটি ইংরেজী হরফে লিখে ফেলে স্পেসবার চাপুন, তাহলেই সেটি বাংলায় রূপান্তরিত হবে (একই শব্দের একাধিক বানান-বিকল্প শব্দটির উপরে মাউস রেখে ক্লিক করে দেখে নেয়া যায়); অথবা, (গ) মাউস ক্লিক করে বাংলা লিখুন; অথবা, (ঘ) আপনার কম্পিউটারে অভ্র কীবোর্ড স্থায়ীভাবে ইনস্টল করে নিয়ে। কীবোর্ডগুলোর ব্যবহার বা লে‌-আউট জানা না থাকলে "বাংলা বর্ণমালা বিভ্রাট" লিংক অথবা "বাংলা কীবোর্ড লে-আউট" লিংক থেকে বিস্তারিত জেনে নিন। এরপরও সমস্যার সম্মূখীন হলে ব্লগ এডমিন এর কাছে সাহায্যের জন্য লিখুন।