আনা আল-হক্ক কিংবা চলমান এক প্রমিথিউসের গল্প
আজ ২৭ মার্চ ৯২২ এর এই দিনে মনসুর আল-হাল্লাজ (৮৫৭/৫৮—৯২২ খ্রিষ্টাব্দ) ওরফে আনাল হক্ককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। যিনি আনা আল-হক্ক নামেই সর্বাধিক পরিচিত, তিনি জন্মগ্রহণ করেন পারস্যের আল বাইজা নগরীর তূর এলাকায়। আল বাইজা তখন আরব-শাসনের এক নগরী। তিনি আরবেরই ওয়াসিত স্কুলে মাত্র বারো বছর বয়সে কোরানের হাফেজ হয়ে যান। এবং কথিত আছে, তিনি তা করেন মরমি উপলব্ধি থেকেই। পরবর্তী কালে তিনি তোস্তারের শাহল বিন আবদুল্লা এবং তারও পরে বসরার সূফীর খিরকা গ্রহণ করেন উমর বিন উসমান মক্কীর কাছে। তিনি সূফীত্বের যাবতীয় আচারনিষ্ঠার সাথে সন্নিহিত থাকেন দীর্ঘ বিশ বছর। বিয়ে করেন সূফীসাধক ইয়াকুব আল-আক্তা কারনাবাইয়ের কন্যা উম্মুল হুসাইনকে। বিবাহসূত্রেই বিপ্লবী শিয়াদের সাথে তার সংযোগ ঘটে। তখন আলিদ (জাঈদী) ছিলেন তাদের নেতা। তবে একথা বলা যায় যে তিনি সুন্নী মতাদর্শের প্রতিই অনুগত ছিলেন। একসময় তিনি বাগদাদে যান বিখ্যাত সূফী জুনায়েদের কাছে। তিনি নিঃসঙ্গতার সাধনালব্ধ হন এবং তারও পরে মক্কায় যান হজ্ব করতে। সেখানে তিনি পরমাত্তায় লীন হবার কঠোর সাধনা শুরু করেন। তিনি যখন জুনায়েদের দরজায় গভীর রাতে ঘা মারেন, তখন জুনায়েদ কর্তৃক ‘কে’ বলার জবাব হিসাবে তিনি বলেন, ‘আনা আল-হক্ক’। ঈশ্বরত্ব নির্মাণবিষয়ক পরম জ্ঞানের বিষয়ে জুনায়েদের সাথে তার তর্ক-বিতর্ক হয়। ফলশ্র“তিতে তিনি খিরকা ছেড়ে পারস্য ও খোরাসানে যান। অনেক সুন্নী মুসলমান আর খ্রিষ্টান ধর্মানুসারী তার কাছে শিষ্যত্ব বরণ করেন। খোরাসানে তিনি শিয়া আর মুতাযালীদের কবলে পড়েন; এমনকি তাকে জাদুকর বলেও অভিহিত করা হয়। এ ঘটনারও পর তিনি দ্বিতীয়বার হজ্বব্রত পালন করেন চারশ’ অনুসারীসহ। সেখানে তিনি প্রচলিত ধর্ম-অনুরাগীদের তোপের মুখে পড়েন। প্রথমে তুর্কেস্তান এবং পরে ভারত চলে আসেন। তখন বৌদ্ধ, মানী ও সনাতন হিন্দু ধর্মের অনেকেই তাঁর সংস্পর্শে আসেন। ৯০২ সালে তৃতীয় অর্থাৎ শেষবারের মতো হজ্ব পালন করেন তিনি। আরাফাতের ময়দানে তিনি দোয়া করেন এই বলে, আল্লা যেন তাকে অনস্তিত্বে পর্যবসিত করেন। তিনি মানুষের জন্য রক্তাক্ত হতে চান। সাধারণ মানুষের ভিতর তাঁর ঐকান্তিকতা ব্যাপক সাড়া ফেলে দেয়। উঁচু শ্রেণীর মানুষজন তার উপর ক্ষেপে যেতে থাকেন। জাহিরী আইনজীবী হাল্লাজের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ-অভিযোগ আনেন এবং তার মৃত্যুদণ্ড প্রার্থনা করেন।
তাঁর অপরাধ তিনি প্রচলিত ধ্যান-ধারণার বিপরীতে মুক্তঅস্তিত্বের সাধনা করেছেন। নিজের ক্বলবে ঈশ্বরত্ব প্রাপ্ত হচ্ছেন। প্রচলিত চৈতন্যতে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জ করছেন, মানব সম্প্রদায়কে সেই ধারণায় উদ্বুদ্ধ করছেন। তাতেই সমাজের উঁচু শ্রেণী ক্ষেপে উঠে। তাকে শেষতক হত্যাকরত তেল দিয়ে পুড়িয়ে অঙ্গার করে ফেলা হয়। কিন্তু তাকে কি এভাবে হত্যা করা সম্ভব হ’ল? না হা করা যায়নি। এই মেলায় তার মৌলিক কাজ কিতাব তাওয়াসিন-এর ভূমিকা সহযোগে দায়িত্বশীল অনুবাদ করেছেন কথাশিল্পী-কবি রায়হান রাইন। এই গ্রন্থটির বহুল প্রচারে কথা নামের ছোটকাগজে একটি ব্যতিক্রমধর্মী বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। নিম্নে তা প্রদান করা হল।
কথাবিজ্ঞাপনএই মহান সাধক, কবি, মুক্তচিন্তার দার্শনিকের যাবতীয় কর্ম, ভাবনা, জীবনযাপনের যাবতীয় প্রণালীর প্রচার আবশ্যক। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত কোনো মাধ্যমই তা করবে না। এর জন্য বিকল্প মাধ্যমেরই এগিয়ে আসা উচিত। ছোটকাগজ, বিকল্প পত্রিকা, অন লাইন ম্যাগাজিন, ব্লগ, ফেসবুক, ইমেইল ইত্যাদির মাধ্যমে তার ব্যাপারে সুষ্পষ্ট ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন বলে মনে করি।
তিনি আনাল-হক্ক, যাকে আমরা আমাদের কারও কারও স্মৃতিতে শৈশব থেকেই লালন করছি। কারণ, আমরা বিস্ময়ের সাথে ল করলাম, তিনি নিজের মায়াময় সহজিয়া রূপের ভিতর ঈশ্বরত্ব নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। তিনি বলতে পেরেছিলেন, আনাল-হক্ক অর্থাৎ আমিই আমার ঈশ্বর। তখন শৈশবের সেই মায়মাময় দিনগুলিতে মানবের চূড়ান্ত মতা প্রাপ্তির লোভ জাগে। মুক্তচৈতন্য ধারণকারী মানব হিসাবে নিজেকে সাত-আসমানের মতো বিশাল মনে হতে থাকে। সেই আনাল হক্ককে নিয়ে চমৎকার একটা কাজ করলেন রায়হান রাইন। যাকে আল্লামা ইকবাল তার জাভি নামায় বলেছিলেন, ‘প্রমিথিয়ান ব্যক্তিত্ব’। তিনি আনাল-হক্ক ওরফে মনসুর আল-হাল্লাজের কিতাব আল-তাওয়াসিনের ভাষান্তর ও সম্পাদনা করেছেন। এটি কথাশিল্পী পারভেজ হোসেনের সংবেদ নামের প্রকাশনা থেকে এইবারের একুশে মেলাতেই প্রকাশিত হ’ল। পারসিক এই কবি ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তির জন্ম খ্রীষ্টীয় নবম শতকে।
আমরা অতঃপর প্রবল বিস্ময় নিয়ে তাঁর কাজটিতে নিমজ্জিত হচ্ছি। রায়হান শুধু অনুবাদ করেই ক্ষান্ত হন নি, তিনি আনাল-হক্ক, সূফিইজম, পরম সত্য, সহজিয়া জ্ঞান ইত্যাদির উপর অতি চমৎকার একটি ভূমিকা লিখেছেন। যাতে আছে রাবেয়া বশরী কর্তৃক সৌন্দর্যকে খোঁজার ইশারা, মহান মানব রুমীর মসনবী নিয়ে কিছু কথা, সর্বমানবের কল্যাণমুখরতার এক জায়মান কথকতা। এতে পরম সত্তা, পরম সত্তার সাথে জীবনের লেনদেন, এর ইতিহাস, ধর্মীয় প্রাবল্যবাদিতার বিরুদ্ধে মনোজাগতিক আবহ তৈরি করার কাজ করে যাচ্ছে।
মনসুর আল-হাল্লাজের রচনায় আছে হযরত মুহাম্মদকে নিয়ে নব্যুয়তের দ্বীপ, বোধশক্তির তা-সিন, বৃন্দ/বিন্দুর তা-সিন, সর্বোপরি গুপ্তজ্ঞানের বাগান নিয়ে মরমী জ্ঞানবিকাশের দরকারি এক কাজ। তিনি এতে কিছু কথকতার প্রবর্তন করেছেন, যেখানে সাঙ্কেতিক ভাষা প্রয়োগ করা হয়েছে। কারণ, এ গল্প এমনই সময়ের গল্প যখন ভাষাচিহ্ন তা ধারণ করতে অম।
সবচেয়ে বড়ো কথা হচ্ছে, ইসলামের প্রাবল্যবাদিতার এই কালে পরম সত্তাকে চেনার এক অতি দরকারি ইঙ্গিত এতে আছে।
আসুন পাঠকসকল, আপনাপন ঈশ্বরত্ব নির্মাণে ব্রতী হই, মরমিয়া প্রেমের শহীদকে শুদ্ধতায় ক্রমাগত স্মরণ করি ।
৬ টি মন্তব্য/প্রতিক্রিয়া এসেছে এ পর্যন্ত:
আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে নিচের মন্তব্য-ফর্ম ব্যবহার করুন:
* ভাষা: মন্তব্যের ভাষা হওয়া উচিত (মূলত) বাংলা — অবশ্যই বাংলা হরফে। আর ভাষারীতি লেখ্যভাষা হিসেবে প্রচলিত প্রমিত বাংলা হওয়াই শ্রেয়।
** মডারেশন: মন্তব্যের ক্ষেত্রে এখানে প্রাক-অনুমোদন মডারেশনের চর্চা নেই। তবে যে-সব কারণ উপস্থিত থাকলে প্রকাশিত মন্তব্য বিনা নোটিশে (এবং কোনো ধরণের কারণ-দর্শানো ছাড়াই) পুরোপুরি মুছে দেয়ার বা আংশিক সম্পাদনা করার অধিকার "মুক্তাঙ্গন" সংরক্ষণ করে, সেগুলো হলো: (ক) সাধু এবং চলিত রীতির সংমিশ্রণ; (খ) ত্রুটিপূর্ণ বানানের আধিক্য; (গ) ভাষার দুর্বল, আঞ্চলিক, অগ্রহণযোগ্য বা ছাপার অযোগ্য প্রয়োগ; (ঘ) ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রবণতা, ছিদ্রান্বেষণ ও কলহপ্রিয়তা; (ঙ) অপ্রাসঙ্গিকতা ও বক্তব্যহীনতা। এ ব্যাপারে মডারেশন টিমের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। তাই, চূড়ান্তভাবে পেশ করার আগে "প্রাকবীক্ষণ"-এর মাধ্যমে নিজ-মন্তব্যের প্রকাশিতব্য রূপ যাচাই করে নিন।
*** নিবন্ধিত লেখকদের প্রতি: লেখকের নিজস্ব পাতার প্রকাশিত কাজের তালিকায় আপনার পেশ করা মন্তব্যের তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে লগ-ইন করা অবস্থায় মন্তব্য করুন।














[মন্তব্য-লিন্ক]
লেখককে ধন্যবাদ, চমৎকার লেখা, নামের সাথে পরিচয় ছিলো বাউলদের তত্ত্বকথন মারফত। কিছুটা জানতে পেরে এবং বাকীটা জানার সুযোগ হাতের নাগালে মধ্যে জেনে খুব খুশি।
[মন্তব্য-লিন্ক]
ধন্যবাদ।
[মন্তব্য-লিন্ক]
মনসুর আল-হাল্লাজের কথা প্রথম পড়ি আমার পিতৃদেবের কোন এক ইসলাম বিষয়ক বইয়ে, তাঁর কথা মনে ছিল তাঁর দর্শনের কারণে নয়, তাঁর মৃত্যুর বিভৎসতার কারণে। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর এতটা হিংস্রতা নিয়ে তাঁর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেছিল সম্ভবত এই কারণে যে তিনি মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার সময় যন্ত্রণা এড়ানোর জন্য নিজের দর্শনকে ভুল বলবেন, এর মাধ্যমে তাঁর চিন্তাধারাকে রুদ্ধ করা যাবে। তবে তিনি তা করেননি। যিশু তাঁর ক্রুশবিদ্ধতাকে যেমন মানবজাতির পাপস্খালনের প্রক্রিয়া হিসাবে দেখেছেন, মনসুর আল-হাল্লাজও তাঁর অতীব যন্ত্রনাদায়ক মৃত্যুদন্ডকে অনেকটা সেভাবেই দেখেছেন, Wikipedia হারবার্ট ম্যাসনের উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর মৃত্যুদন্ডের প্রক্রিয়াটিকে বলেছে “…was uniting his beloved God and His community of Muslims against himself and thereby bore witness in extremis to the tawhid (the oneness) of both.”
তাঁর কিতাব তাওয়াসীনের একটি ইংরেজী অনুবাদের লিঙ্ক এখানে
[মন্তব্য-লিন্ক]
মোহাম্মদ মুনিম, আপনার অবজার্ভেশন, স্মৃতিকথন, সর্বোপরি কিতাব আল-তাওয়াসিন-এর লিঙ্কটি দারুণ এক সংযোযন হয়েছে। আসলে এতে অধিক পাঠকের তর্ক-বিতর্ক হলে ভালো হত। তাতে ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিকতার বিপরীতে অল্টারনেট মত তৈরি হওয়ার ক্ষেত্র পাওয়া যেত।
[মন্তব্য-লিন্ক]
বইটি কারা ছেপেছে সে তথ্য উল্লেখ করলে পাঠকরা কিনতে পারে। আর বইটির ভূমিকাটা কি এখানে দেয়া যায়?
[মন্তব্য-লিন্ক]
কিতাব আল-তাওয়াসিন নামের বইটি প্রকাশ করেছে সংবেদ প্রকাশনী (শাহবাগ, ঢাকা; প্রকাশক কথাশিল্পী পারভেজ হোসেন। তার সেলফোন নাম্বার : ০১৮১৯৪৪১৮৮৮) গ্রন্থটির ভূমিকা বেশ বড়ো, তা দেয়া আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। এ ব্যাপারেও আপনি প্রকাশক বা অনুবাদক-এর সাথে যোগাযোগ করতে পারেন_ অনুবাদক রায়হান রাইনের সেলফোন নাম্বার : ০১৫২৩৫২২২৭।