একটি স্মৃতিকথাঃ বালক মাস্তান
ঘটনাটা সম্ভবতঃ ক্লাস ফোরে পড়ার সময়ে। আমাদের স্কুলে ছেলে-মেয়ে দুই সারিতে পাশাপাশি বসতো। মেয়েদের নীল ড্রেস, আমাদের সাদা। আমি একটু পিচ্চি ছিলাম সাইজে তাই মেয়েগুলোকে আমার চেয়ে বড় মনে হতো। দেখতে বড় হলেও কোন কারনে ধারনা জন্মে গিয়েছিল যে মেয়েরা দুর্বল, ছেলেরা সবল। একদিন আমার এক বন্ধু পুটুল আমার হাতে একটা ভাঁজ করা টুকরা কাগজ দিল। কাগজে লেখা ‘হাসান+লাভলী’। মানে কী, বুঝলাম না। এতদিন যোগ বিয়োগ শিখেছি সংখ্যা দিয়ে, মানুষের নাম দিয়ে কখনো অংক দেখিনি। তবু ব্যাপারটায় মজা পেলাম, বিশেষতঃ নিজের নামের সাথে লাভলীকে দেখে। লাভলী মেয়েদের ফার্স্ট গার্ল, ফর্সা-সুন্দর, আমার চেয়ে ইঞ্চি দুয়েক লম্বা। একটু পরে আমি আরেকটা কাগজে ‘পুটুল+শামীম’ লিখে ওর হাতে দিলাম। শামীম মেয়েদের সেকেন্ড গার্ল, শান্ত-ভদ্র। এরপর দুজনে হাসাহাসি করলাম কতক্ষন এবং কাগজ দুটো বাইরে ফেলে দিলাম। ব্যাপারটা শেষ হতে পারতো এখানেই।
কিন্তু না, ঘন্টাখানেক পরেই হেডস্যারের রুমে দুজনের ডাক পড়লো। স্যার আমাদের নাম ইত্যাদি জিজ্ঞেস করলো। তারপর পকেট থেকে দুটুকরো কাগজ বের করে দেখালো। সেই দুটি কাগজ! সর্বনাশ!! লাভলীকে একটু আগে দেখেছি বাইরে কী যেন খুঁজছে। সে-ই এটা খুঁজে এনে হেড স্যারের কাছে দিয়েছে । ভয়ে কলিজা শুকিয়ে গেল। এতক্ষনে ব্যাপারটার আপেক্ষিক গুরুত্ব বুঝলাম। এরপর স্যারের হাতে থাকা মোটা বেতের ঘনত্ব বুঝবো, তারপর আমাদের চামড়ার পুরুত্ব। ভয়ে পেশাব করে দেবার অবস্থা হওয়ায় দোষ স্বীকার করে ফেললাম আমি। ফলে শাস্তিটা একটু লঘু হলো। স্যার গমগমে স্বরে বললেন, ‘তোরা দুজন স্কুল ছুটি না হওয়া পর্যন্ত দুই হাতে একে অপরের কান ধরে উঠবস কর।’ স্যার গুনতে শুরু করলেন, এক, দুই, তিন…….। হঠাৎ খেয়াল হলো স্যারের রুমের জানালায় কৌতুহলী জনতার খিক খিক হাসি। ক্লাসের সব মেয়ে লাভলীর নেতৃত্বে সিনেমা দেখছে। এতক্ষন শাস্তিটা অত খারাপ লাগেনি, এবার চরম অপমানে আমাদের কানটান লাল হয়ে গেল। শুধু তাই না, স্কুল ছুটির পর লাভলীরা স্কুলের গেট পার হবার সময় আমাদের সব ছেলেকে পা দেখিয়ে দেখিয়ে বাড়ী গেলো।
পরদিন ক্লাসের ছেলেরা ছেলেদের ক্যাপ্টেন তৈয়বের নেতৃত্বে এই ঘটনার প্রতিশোধ নেবার জন্য গোপন সিদ্ধান্ত নিল। মেয়েদের কাছে এভাবে অপমানিত হবার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো। তৈয়ব খুব সাহসী, গায়ে জোরও বেশ। ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া নিয়ে লাভলীর সাথে দ্বন্দ্ব ছিল একটা। সে একারনেই এগিয়ে এল পাল্টা আঘাত হানতে। পরদিন স্কুল ছুটির পরপর আমি, তৈয়ব আরো কয়েকজন আগে আগে বেরিয়ে রাস্তার পাশে নির্জন একটা জায়গায় গাছের আড়ালে দাড়িয়ে থাকলাম। লাভলীরা দুবোন এ পথে বাসায় যায়। কিছুক্ষন পর লাভলীকে দেখা গেল। কাছাকাছি আসতেই তৈয়ব আর আমি এক দৌড়ে লাভলীর পেছনে গিয়ে দুজন দুপাশ থেকে পিঠের উপর কয়েক সেকেন্ড দমাদম চড়চাপড় কিলঘুষির ব্ন্যার সাথে বললাম – ‘আর পা দেখাবি, বিচার দিবি?’ তারপর সে ভ্যাঁ করে ওঠার আগেই পগার পার। দুর থেকে দেখলাম লাভলী কাঁদতে কাঁদতে বাড়ী যাচ্ছে। তৃপ্তি পেলাম।
হেডস্যারের ভয়ে পর পর দুদিন স্কুলে গেলাম না। তৃতীয় দিন দুরু দুরু বক্ষে ক্লাসে ঢুকলাম। লাভলীর দিকে ভুলেও তাকাচ্ছি না। অপেক্ষায় আছি হেড স্যার কখন ডাকবে ! কিন্তু ক্লাস শেষ হলো, ডাক আসলো না আর। অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েষ্টার্ন ফ্রন্ট। লাভলী ভয়ে বিচার দেয়নি স্যারকে। প্রথম মাস্তানীর সফল সমাপ্তি ঘটলো।
১২ টি মন্তব্য/প্রতিক্রিয়া এসেছে এ পর্যন্ত:
আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে নিচের মন্তব্য-ফর্ম ব্যবহার করুন:
* ভাষা: মন্তব্যের ভাষা হওয়া উচিত (মূলত) বাংলা — অবশ্যই বাংলা হরফে। আর ভাষারীতি লেখ্যভাষা হিসেবে প্রচলিত প্রমিত বাংলা হওয়াই শ্রেয়।
** মডারেশন: মন্তব্যের ক্ষেত্রে এখানে প্রাক-অনুমোদন মডারেশনের চর্চা নেই। তবে যে-সব কারণ উপস্থিত থাকলে প্রকাশিত মন্তব্য বিনা নোটিশে (এবং কোনো ধরণের কারণ-দর্শানো ছাড়াই) পুরোপুরি মুছে দেয়ার বা আংশিক সম্পাদনা করার অধিকার "মুক্তাঙ্গন" সংরক্ষণ করে, সেগুলো হলো: (ক) সাধু এবং চলিত রীতির সংমিশ্রণ; (খ) ত্রুটিপূর্ণ বানানের আধিক্য; (গ) ভাষার দুর্বল, আঞ্চলিক, অগ্রহণযোগ্য বা ছাপার অযোগ্য প্রয়োগ; (ঘ) ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রবণতা, ছিদ্রান্বেষণ ও কলহপ্রিয়তা; (ঙ) অপ্রাসঙ্গিকতা ও বক্তব্যহীনতা। এ ব্যাপারে মডারেশন টিমের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। তাই, চূড়ান্তভাবে পেশ করার আগে "প্রাকবীক্ষণ"-এর মাধ্যমে নিজ-মন্তব্যের প্রকাশিতব্য রূপ যাচাই করে নিন।
*** নিবন্ধিত লেখকদের প্রতি: লেখকের নিজস্ব পাতার প্রকাশিত কাজের তালিকায় আপনার পেশ করা মন্তব্যের তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে লগ-ইন করা অবস্থায় মন্তব্য করুন।













[মন্তব্য-লিন্ক]
ব্রাভো!
[মন্তব্য-লিন্ক]
হা হা! মাস্তানী কি ওখানেই থেমেছিলো, নাকি আরো অনেক দূর গড়িয়েছে?
[মন্তব্য-লিন্ক]
বেশীদুর গড়াবার সুযোগ পায়নি। তার আগেই বিনা দোষে হাজতবাস করে পুলিশের খাতায় নাম উঠে গিয়েছিল এবং মাস্তানীর কবর রচিত হয়েছিল। নাহলে কী হতো বলা মুশকিল।
[মন্তব্য-লিন্ক]
“অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েষ্টার্ন ফ্রন্ট ”
মাফ করবেন। এরকম একটা অসাধারণ যুদ্ধোপন্যাসের নাম ‘রম্য’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় বেখাপ্পা লেগেছে। তবে আপনার স্মৃতিকথা দুর্দান্ত !
[মন্তব্য-লিন্ক]
এত ছোট বয়সে মান অপমান বোধের এমন টনটনে জ্ঞান কিভাবে সম্ভব ?
আপনার ভান্ডারে জমা এই ‘স্মৃতি কথার’ পরের কথাগুলোই হয়তো আসল কথা। সেগুলো জানিয়ে দিলে ক্ষতি কি ভাই?
[মন্তব্য-লিন্ক]
অপমানবোধ আরো ছোটকাল থেকেই জন্মায়। বড়রা সেটা খেয়াল করি না বলেই বুঝিনা। স্মৃতিকথার পরের কথাগুলো বলার সুযোগের অপেক্ষা করছি।
[মন্তব্য-লিন্ক]
সন্ধানী ভাই, রবীন্দ্রনাথই তো বলে দিয়েছেন যে কিশোর বয়সের মতো বালাই আর নাই। মূলত কৈশোরেই মানুষের আত্মসম্মানবোধ সবচে’ বেশি টনটনে থাকে।
লেখাটা নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয় হয়েছে !
[মন্তব্য-লিন্ক]
একবিংশ শতাব্দীতে এসে বোধের বিষয়গুলো আরো এগিয়েছে। আমার দুই বছর বয়সী মেয়ের কন্যার অপমানবোধ চমকে যাবার মতো। দোষ না করলে কেউ ‘সলি’ বলাতে পারবে না। বাপ কা বেটি তো!
[মন্তব্য-লিন্ক]
-কোন কারনে ধারনা জন্মে গিয়েছিল যে মেয়েরা দুর্বল, ছেলেরা সবল . . . তৈয়ব আর আমি এক দৌড়ে লাভলীর পেছনে গিয়ে দুজন দুপাশ থেকে পিঠের উপর কয়েক সেকেন্ড দমাদম চড়চাপড় কিলঘুষির ব্ন্যার সাথে বললাম – ‘আর পা দেখাবি, বিচার দিবি?’ তারপর সে ভ্যাঁ করে ওঠার আগেই পগার পার। . . .
একবার ভেবেছিলাম এই দু’টো বাক্য নিয়ে প্রবল আপত্তি জানাবো। ছ্যাঁ ছ্যাঁ করে উঠবো পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বেড়ে ওঠা কলুষিত শিশুমন (patriarchal perceptions অর্থে), নারীর প্রতি সহিংসতা ইত্যাদি বিষয়গুলো তুলে ধরে। কিন্তু লেখাটি এতই মজার যে সে ইচ্ছে ত্যাগ করলাম। শিশুদের খেলার মাঠের আদান প্রদান নিয়ে তত্ত্ববাজি করার মত অতটা বেরসিক হয়ে উঠতে পারিনি দেখে মনে মনে আশ্বস্তবোধ করলাম।
কিন্তু যাই বলুন, শিভালরির যুগটার সমাধি হয়ে গেল ভাই। যে বয়সটার কথা লিখলেন, সে বয়সে আমার ধারণা ছিল গুন্ডাদের হাত থেকে কারো (‘প্রেয়সী’ পড়তে হবে এখানে) প্রাণ কিংবা সম্ভ্রম বাঁচানো (ব্যাকগ্রাউন্ডে ঢিসুম ঢিসুম শব্দ কল্পনা করে নিতে হবে) প্রেমের একটি অপরিহার্য উপাদান। সেখানে, কেউ কেউ যখন পছন্দের নারীর জন্য ১০৮-টা নীলপদ্ম এনে দেবার অঙ্গীকার করছে (হোক সে মিছিমিছি), তখন আপনারা দুই বন্ধু মিলে কিলিয়ে প্রেমের (এবং প্রেমিকার) কাঁঠাল পাকাচ্ছেন! বড়ই ব্যথিত হলাম।
শিশুদের সম্মানবোধের কথা যখন উঠেই গেল, তখন ভয়ে ভয়ে আরেকটা কথা বলি। আমরা যতটা ভাবতে পছন্দ করি, শিশুরা কিন্তু ততটা প্রেম, যৌনতা বা রোমান্টিক চেতনাহীন নয়। কি জানি খেলার মাঠে সাপ ছেড়ে দিলাম কিনা!
[মন্তব্য-লিন্ক]
আপনার সুন্দর মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। আসলে প্রেম প্রস্ফুটিত হবার সময় পায়নি। তার আগেই লাভলীর বেরসিক নালিশ প্রেমকে প্রতিহিংসায় পরিনত করেছিল। আপনি ঠিকই ধরেছেন শিশুদের যৌনচেতনাবোধ আমাদের ধারনারও আগে থেকে জন্মায়। শিশুভেদে বয়সটা ভিন্ন হতে পারে। একই বয়সের আমার আরেকটি অভিজ্ঞতার কথা পড়ে দেখতে পারেন ‘জুনাব আলীর অপারেশান পাখীর বাসা’ শিরোনামে।
[মন্তব্য-লিন্ক]
লাভলী যে কেন চিরকুটগুলো অত কষ্ট করে খুঁজে বের করেছিল, তাতে তার আসলে আশা ভঙ্গ হয়েছিল কি না এবং সে কারণেই সে নালিশ করেছিল কি না কে জানে (খেলার মাঠে সাপ ছেড়ে দেয়া হয়েছে, এখন কেউ তা খোলাসা করে ব্যাখ্যা করতে পারেন, লাভলী নিজে এসেও বলতে পারেন… আমরা প্রীত হব)!
আর নীড়সন্ধানী বলছেন, এটা তার প্রথম মাস্তানী… আপনার দ্বিতীয় মাস্তানীর বিবরণ পাওয়ার জন্যে উদগ্রীব হয়ে রইলাম ভাই…
[মন্তব্য-লিন্ক]
প্রেম বিষয়ে এটাই প্রথম এবং শেষ সফল মাস্তানী। পরবর্তী মাস্তানীর লজ্জাজনক ব্যর্থতার কারনে সেগুলো বলে স্মৃতিকে বিব্রত করতে চাই না। মানুষ শুধু সাফল্যের গৌরবগাথাই গাইতে চায়….হে হে