সৈকত আচার্য


সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

আইনজীবি। ব্লগার।



প্রয়োজনে ঘৃণা করার দুঃসাহস দেখাব

ইদানীং দেশের একজন বড় আইনজীবী প্রায়শই বলেন, চলমান দুর্নীতি বিরোধী অভিযান সফল করতে এবং সমাজকে দুর্নীতির রাহুমুক্ত করতে তিনি প্রয়োজনে জীবন দেবেন। জীবন দেয়া সহজ কাজ নয়। জলপাই-আশ্রিত কেউ জীবন দেয় না। ফলে, এটা তাঁর কথার কথা। মানে বাজে কথা। ইদানীং তিনি আরো একটি কাজ প্রায়ই করেন। বেশ রেগে যান, ধমক-ধামক দেন, চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন বক্তৃতা-সভায়। বলেন, “যথেষ্ট হয়েছে — আসুন, এই সরকারের সাথে একযোগে কাজ করি।” তিনি বলেন, “এ সরকারের কোনো মেয়াদ নেই। ইলেকশন না হলে তার দায়ভার নেই।” প্রয়োজনে তিনি সাংবিধানিক ব্যাখ্যা দেবেন। কারণ, জনগণ সকল ক্ষমতার মালিক হলেও সংবিধানের মালিক হতে পারেনি। আজ অবধি নয়। এটার মালিক তিনি। এটা বোঝেন কেবল তিনি এবং আরো কিছু স্বঘোষিত সংবিধান বিশেষজ্ঞ। আর কিছু চাটুকার এঁদের মহান করে তোলেন, প্রতিনিয়ত।

সুপ্রীম কোর্ট সংবিধানের অভিভাবক। এতদিন এটাই জানতাম। কিন্তু বর্তমান সরকারের মেয়াদ প্রশ্নে, স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে, দুদক-এর কার্যক্রম প্রশ্নে এবং আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্নে সুপ্রীমকোর্টের মতামত নেয়ার বদলে বড় আইনজীবীর মতামত চাওয়া হচ্ছে। তিনি বিধান দিয়ে চলেছেন, শাস্ত্র বিচার করে। তাঁর এই বিধান যেন ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম। রাষ্ট্রীয় প্রচার চালানো হচ্ছে এভাবেই। সন্তানের করুণ পরিণতি দেখছেন অভিভাভক, অসহায়-স্বাধীন চোখে!

অনেক আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালিকে সতর্ক করেছিলেন — শাস্ত্রবেত্তা এই ব্রাহ্মণকুল অনেক রকম বিধান দিয়ে থাকেন, দক্ষিণার জোরে। কোত্থেকে দক্ষিণা আসছে, জানতে চাই, মনে সন্দেহ বাড়ছে। এবং তা জোরালো হচ্ছে। মানুষের ধনসম্পদ যারা লুণ্ঠন করে তারা তস্কর। সংবিধান লংঘন করে দেশ যারা শাসন করে তারা ডাকাত। সবচেয়ে বড় দুর্বৃত্ত। একটা জাতির সম্মিলিত ইচ্ছার দলিল সংবিধান। এই দলিলের তোয়াক্কা না করে দেশ চালানো শুধু দুর্নীতিই নয়, দেশদ্রোহিতাও বটে। এই দেশদ্রোহীদের সাথে একই ছাতার তলে বসে দুর্নীতি নির্মূলের ডাক দেয়া এবং জীবন বলিদান করার ঘোষণা দেয়া জাতির সাথে প্রতারণার শামিল। ১৬৬ জনকে ক্রস ফায়ার করে, আদিবাসী হত্যা করে, তাদের জীবন বিষিয়ে তুলে, সাংবাদিক নির্যাতন করে, শিক্ষকদের অপমান করে, জনগণের মৌলিক মানবিক অধিকার বছরের পর বছর শিকেয় তুলে রেখে, শ্রমিক অসন্তোষ ও মূল্য সন্ত্রাস ছড়িয়ে দিয়ে জীবনের সর্বক্ষেত্রে চূড়ান্ত ধস নামানোর আয়োজন যারা আজ করছে — তারা দেশদ্রোহী, সন্ত্রাসী, বর্বর। এদের সহযোগী শাস্ত্রবিশারদগণ। এখনও সম্মান দিতে চাই, যেমনটা সবসময় দিয়েছি। জাতিকে বিভ্রান্ত করা থেকে নিজেকে বিরত রাখুন। নইলে ঘৃণা করার দুঃসাহস দেখাব।

পোস্ট কিংবা মন্তব্যে প্রকাশিত মতামত কোন অবস্থাতেই মুক্তাঙ্গন কর্তৃপক্ষের মতামতের প্রতিফলন নয়। বক্তব্যের দায়ভার লেখক এবং মন্তব্যকারীর নিজের। শুধুমাত্র "মুক্তাঙ্গন" নামের আওতায় প্রকাশিত বক্তব্যই ব্লগের যৌথ অবস্থানকে নির্দেশ করে।


৩ টি মন্তব্য/প্রতিক্রিয়া এসেছে এ পর্যন্ত:

  1. কেবল ঘৃণা দিয়ে বুদ্ধিজীবিতার এই পরাভব আর দেশ ও জাতির এই নিরুদ্দেশ যাত্রা ঠেকানো যাবে না…

  2. মাসুদ করিম মাসুদ করিম লিখেছেন:

    বাংলাদেশে লুটেরাদের সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি সুশীলকান্তরা, যেমনি বাংলাদেশে জঙ্গীদের সবচেয়ে বড় সহায়ক শক্তি মৌলবাদী প্রতিষ্ঠিত মাওলানারা। হ্যাঁ এদেরকে ঘৃণা করাই উচিত, কিন্তু একে কী দুঃসাহস বলা যায়।

  3. মাসুদ করিম মাসুদ করিম লিখেছেন:

    আজকের সমকালে রাহাত খানের কলামে কামাল হোসেন নিয়ে কিছু কথা এখানে উদ্ধৃত করে রাখা প্রয়োজনীয় মনে হল।

    মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান কর্তৃক আহূত ইসি সংলাপে যোগ দিয়ে আরও দুটি ক্ষুদ্র দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ গত ২ জানুয়ারি তাদের আলাদা প্রস্তাবে জাতীয় নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছে। এর আগের দিন সংলাপে বসে বর্ষীয়ান আইনজীবী ও রাজনীতিক ড. কামাল হোসেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে।
    ড. কামাল হোসেনের বক্তব্যটি উল্লেখ ও পর্যালোচনার দাবি রাখে। তিনি তো শুধু একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী নন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রিয়পাত্র ছিলেন তিনি। আইন পেশা থেকে বঙ্গবন্ধুই তাকে রাজনীতিতে নিয়ে আসেন। তবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অধিকাংশ সময় তিনি কাটিয়েছেন তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানে। শ্বশুরবাড়ির নিরাপদ আশ্রয়ে। ১৯৭১ সালে বাঙালির সেই জান-তোলপাড় মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে দেশে বা বিদেশে টুঁ শব্দটিও করেননি। করেছেন এমন কোনো প্রমাণ কোথাও নেই।
    এরপরও যৌথ বাহিনীর হাতে বর্বর পাকিস্তান বাহিনীর পরাজয়, আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণ এবং দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার পর বিশ্ব জনমতের চাপে দুঃসহ কারাবাস থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যখন মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার, তখন সৌজন্যবশে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সরকারের কাছে বন্ধুত্বসুলভ কোনো উপহার আশা করেন কিনা। বঙ্গবন্ধুর তাৎক্ষণিক জবাব ছিল : আমার কামালকে (ড. কামাল হোসেন) আমার সঙ্গে বাংলাদেশে যেতে দিন।
    বঙ্গবন্ধুর সেই স্নেহধন্য কামাল হোসেন লন্ডন ও দিলি্ল হয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গেই ১০ জানুয়ারি (১৯৭২) একই প্লেনে বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। আইনজীবী ও কূটনীতিক বিবেচনায় অযোগ্য লোক ছিলেন না ড. কামাল হোসেন। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা-পরবর্তী সরকারে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে বৃত হন।
    তারপর রাজনীতিতে বহু রহস্যজনক এবং কোনোদিনই জবাব না পাওয়া বহু ঘটনা ঘটেছে। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস ঘটনার ঠিক আগে আগে হঠাৎ উচ্চ পর্যায়ের একটি স্কলারশিপ নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন কেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে গেলেন সে এক দুর্জ্ঞেয় রহস্য। ১৯৮০ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং রাজনীতিতে তাকে সংস্থিত করার ব্যাপারে ড. কামাল হোসেনের একটা ইতিবাচক সক্রিয় ভূমিকা ছিল। অস্বীকার করার উপায় নেই, সে সময় আওয়ামী লীগের একজন গর্ব করার মতো নেতা তিনি ছিলেন। কিন্তু তারপর কী ঘটল? কী ঘটেছিল? এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন সাফল্যের তুঙ্গে, হঠাৎ আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হলেন বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য ‘আমার কামাল’, রাজনীতিবিদ ড. কামাল হোসেন।
    বিষয়টি সে সময়ে আমাকে এবং দেশের দল নির্বিশেষে বহু লোককে বিচলিত করেছিল। দুঃখ পেয়েছিলাম খুব। সেই দুঃখের কথা জানিয়েও ছিলাম জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত এবং মনের দিক দিয়ে একটুও ভেঙে না পড়া আওয়ামী লীগ নেত্রী, বর্তমানের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। এর তাৎক্ষণিক জবাবও আমাকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনটি ফটোগ্রাফ দেখানো হয় আমাকে। একটি ফটোগ্রাফে দেখা যায়, কামাল হোসেন ও ঢাকায় পাকিস্তানের তদানীন্তন রাষ্ট্রদূতকে নিচু টেবিলে খুব কাছাকাছি মুখোমুখি বসে কথা বলতে। দ্বিতীয় ছবিতে খুবই কাছাকাছি এবং মুখোমুখি বসা অবস্থায় দেখা যায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এবং তখনও আওয়ামী লীগের খুবই প্রভাবশালী নেতা ড. কামাল হোসেনকে। তৃতীয় ফটোগ্রাফটি খুব কাছাকাছি গোল হয়ে বসে আলাপরত অবস্থায় দেখা যায় ঢাকার তদানীন্তন পাকিস্তানি হাইকমিশনার, ড. কামাল হোসেন ও খালেদা জিয়াকে। একই রকম নিচু টেবিলে। একই পোশাকে।
    জীবনানন্দ দাশের কবিতার ভাষায় বলতে হয় : কি কথা তার সাথে? তাহার সাথে! তবে জীবনানন্দ দাশ প্রসঙ্গের ইতি টেনে বলি, আওয়ামী লীগ থেকে ড. কামাল হোসেনের বহিষ্কারের জবাব আমি পেয়ে গিয়েছিলাম। পলাশী যুদ্ধের আগে মেহেরপুরের নীলকুঠিতে নদীপথে বিশেষ বজরায় করে ঘসেটি বেগম, জগৎ সিং, রাজবল্লভ প্রমুখ লোকজন আসতেন রবার্ট ক্লাইভ এবং তার সাঙ্গপাঙ্গদের সঙ্গে দেখা করতে। এ ঘসেটি বেগমরা নিশ্চয় মেহেরপুর নীলকুঠিতে শুধু সুস্বাদু আম খেতে যেতেন না!
    তবু এই আইনজীবী ও পার্টটাইম রাজনীতিকের নাম ড. কামাল হোসেন। এখনও বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক নন। খ্যাতির শীর্ষে ওঠা একজন আইনজীবী তো বটেই, গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকও বটে। অত্যন্ত সম্মানিত। অত্যন্ত শ্রদ্ধেয়। গত ১ জানুয়ারি সংলাপে বসে মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার দাবি তুলেছেন তিনি। বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহালের দাবি শুধু বিএনপির নয়, গোটা জাতির। গোটা জাতি বলতে ড. কামাল হোসেন কী বোঝাতে চান, তা তিনিই জানেন।

    লিন্ক এখানে

আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে নিচের মন্তব্য-ফর্ম ব্যবহার করুন:

=নিয়মাবলি=
* ভাষা: মন্তব্যের ভাষা হওয়া উচিত (মূলত) বাংলা — অবশ্যই বাংলা হরফে। আর ভাষারীতি লেখ্যভাষা হিসেবে প্রচলিত প্রমিত বাংলা হওয়াই শ্রেয়।
** মডারেশন: মন্তব্যের ক্ষেত্রে এখানে প্রাক-অনুমোদন মডারেশনের চর্চা নেই। তবে যে-সব কারণ উপস্থিত থাকলে প্রকাশিত মন্তব্য বিনা নোটিশে (এবং কোনো ধরণের কারণ-দর্শানো ছাড়াই) পুরোপুরি মুছে দেয়ার বা আংশিক সম্পাদনা করার অধিকার "মুক্তাঙ্গন" সংরক্ষণ করে, সেগুলো হলো: (ক) সাধু এবং চলিত রীতির সংমিশ্রণ; (খ) ত্রুটিপূর্ণ বানানের আধিক্য; (গ) ভাষার দুর্বল, আঞ্চলিক, অগ্রহণযোগ্য বা ছাপার অযোগ্য প্রয়োগ; (ঘ) ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রবণতা, ছিদ্রান্বেষণ ও কলহপ্রিয়তা; (ঙ) অপ্রাসঙ্গিকতা ও বক্তব্যহীনতা। এ ব্যাপারে মডারেশন টিমের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। তাই, চূড়ান্তভাবে পেশ করার আগে "প্রাকবীক্ষণ"-এর মাধ্যমে নিজ-মন্তব্যের প্রকাশিতব্য রূপ যাচাই করে নিন।
*** নিবন্ধিত লেখকদের প্রতি: লেখকের নিজস্ব পাতার প্রকাশিত কাজের তালিকায় আপনার পেশ করা মন্তব্যের তালিকাভুক্তি নিশ্চিত করতে লগ-ইন করা অবস্থায় মন্তব্য করুন।


অভ্র প্রভাত ফোনেটিক ইউনিজয় ইংরেজী
------------(মাউস ক্লিক করে বাংলা লিখুন)------------


বাংলায় মতামত লিখতে নিচের যে কোন একটি পদ্ধতি বেছে নিন:
(ক) সংযুক্ত চারটি বাংলা কী‌বোর্ডের (ইউনিজয়, ফোনেটিক, প্রভাত) যে কোন একটি বেছে নিয়ে; অথবা, (খ) গুগল বাংলা ট্রান্সলিটারেশন টুল ব্যবহার করেও সহজে বাংলা লেখা সম্ভব। বাংলা অক্ষর চালু/বন্ধ করতে ctrl+g চাপুন। শব্দটি ইংরেজী হরফে লিখে ফেলে স্পেসবার চাপুন, তাহলেই সেটি বাংলায় রূপান্তরিত হবে (একই শব্দের একাধিক বানান-বিকল্প শব্দটির উপরে মাউস রেখে ক্লিক করে দেখে নেয়া যায়); অথবা, (গ) মাউস ক্লিক করে বাংলা লিখুন; অথবা, (ঘ) আপনার কম্পিউটারে অভ্র কীবোর্ড স্থায়ীভাবে ইনস্টল করে নিয়ে। কীবোর্ডগুলোর ব্যবহার বা লে‌-আউট জানা না থাকলে "বাংলা বর্ণমালা বিভ্রাট" লিংক অথবা "বাংলা কীবোর্ড লে-আউট" লিংক থেকে বিস্তারিত জেনে নিন। এরপরও সমস্যার সম্মূখীন হলে ব্লগ এডমিন এর কাছে সাহায্যের জন্য লিখুন।